রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোডের প্রিমিয়ার ব্যাংকের শাখায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ক্যাশ কাউন্টার থেকে ২৩ লাখ টাকা লুটের ঘটনা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র একজন অস্ত্রধারী কীভাবে ব্যাংকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিম্মি করে টাকা নিয়ে গেলো, তা নিয়ে সন্দেহ কাটছে না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, অস্ত্রধারী যাওয়ার সময় ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রাখার ডিভিআর যন্ত্রটিও নিয়ে গেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এককভাবে এমন একটি ঘটনা ঘটানো কঠিন। ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কোনও কর্মকর্তা জড়িত আছে কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত সোমবার (২০ আগস্ট) বাড্ডার লিংক রোডের প্রিমিয়ার ব্যাংকের শাখার ম্যানেজার ফজলুল হককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ২৩ লাখ টাকা নিয়ে যায় এক অস্ত্রধারী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, ‘মাত্র একজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সবাইকে জিম্মি করে কীভাবে টাকা নিয়ে গেলো তা একটু সন্দেহজনক। ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজও পাওয়া যায়নি। ঘটনার সময় বাইরের কোনও গ্রাহকও ছিল না। এ কারণে সব বিষয় মাথায় রেখেই বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।’
লুটের ঘটনার একদিন পর মঙ্গলবার (২১ আগস্ট) রাতে প্রিমিয়ার ব্যাংকের জেনারেল সার্ভিস ডিভিশনের সিনিয়র অফিসার রাহাত আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা একজনকে আসামি করে বাড্ডা থানায় মামলা (নম্বর- ১৮) দায়ের করেন। রাহাত আলম এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। আমি অফিসের নির্দেশনা অনুসারে থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করেছি।’
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার সময় ব্যাংকের ভেতরে ছয়জন কর্মকর্তা ও একজন নিরাপত্তারক্ষী উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় মাত্র একজন ব্যক্তি একটি অস্ত্র নিয়ে ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে সবাইকে জিম্মি করে ফেলে এবং ২৩ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এসময় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি কেন বাধা দেয়নি আর একজন ব্যক্তির বিপরীতে কেন বাকিরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলো না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনায় ব্যাংকের কারো সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে একজন অস্ত্রধারী লোক ব্যাংকের ভেতরে ঢোকে। এরপর সে সোজা কাচেঘেরা ব্যাংক ম্যানেজারের কক্ষে যায়। সেখানে ম্যানেজারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভল্ট রুমে ঢুকতে বলে। সবাই ভল্ট রুমে ঢোকার পর অস্ত্রধারী ওই সন্ত্রাসী ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার থেকে ২৩ লাখ টাকা নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে ব্যাংকের ভেতর থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিআর খুলে সঙ্গে নিয়ে যায়। অস্ত্রের মুখে কেউই কোনও প্রতিবাদ করতে পারেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন অস্ত্রধারী অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়ায় কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে। ব্যাংকের ভেতর থেকে ফিল্মি স্টাইলে এভাবে ২৩ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়াটা বিস্ময়কর। এটা দীর্ঘ পরিকল্পনা ও অনেক বেশি সাহসের বিষয়। কারণ, ব্যাংকের ভেতরে সব সময় অস্ত্রধারী নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষী থাকে। এছাড়া বিকেল ৪টার দিকে সাধারণত লেনদেন শেষ হওয়ার আগেই মূল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও বাইরে থেকে কীভাবে অস্ত্রধারী ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করলো তা নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এছাড়া টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তি সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রাখা ভিডিআর নিয়ে গেছে বলে বলা হচ্ছে। এটা নিয়ে যাওয়ার জন্যও সময় প্রয়োজন। একজন ব্যক্তির এত ঝুঁকি নিয়ে লুট করার ঘটনা সাধারণত দেখা যায় না।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এমনটা হতে পারে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে কেউ একজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গোপন তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানের কেউ সরাসরি এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। তাছাড়া দিন-দুপুরে একা একজনের পক্ষে ব্যাংকে এমন লুটপাট ঘটানো সহজ নয়।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংক ভবনের আশেপাশের অন্যান্য ভবন ও সড়কের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ঘটনার সময় ব্যাংকে উপস্থিত থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অস্ত্রধারীর শারীরিক বর্ণনাও নেওয়া হয়েছে। এসব পর্যালোচনা করে অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে ঘটনার বিষয়ে ব্যাংকের স্টাফদের আলাদা আলদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বাড্ডা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনও আটক নেই। ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা নিরাপত্তারক্ষীকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। ঘটনার রহস্য উন্মোচনে চেষ্টা চলছে।’
বুধবার বাড্ডা লিংক রোডের গ/৮২ ও ৯০/১ ভবনের প্রিমিয়ার ব্যাংকে শাখায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই ভবনের নিচতলায় ব্যাংকে শাখা। ব্যাংক ভবনের দুই পাশে রয়েছে কয়েকটি ভবন।
স্থানীয়রা এ ঘটনা লোকমুখে শুনেছে বলে জানিয়েছেন। ঘটনার দিন ব্যাংক ভবনে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন নিরাপত্তারক্ষী আলী। তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার পর সেখানে তিনজন নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের একজন ইব্রাহীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি ছিলাম না। আমরা শুনেছি। ওই দিন আলী নামে একজন সিকিউরিটি গার্ড ছিল। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।’
ব্যাংক ভবনটির পাশের বাড়ির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি যে এই ব্যাংকে একটি লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোনোকিছু দেখিনি বা কারও চিৎকার-চেঁচামেচিও শুনতে পাইনি।’
মানিক নামে পাশের গলির এক বাড়ির মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনাটি মঙ্গলবার রাতে শুনেছি। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে সোমবার বিকালে। এলাকায় লোকমুখে এই ব্যাংক থেকে টাকা লুটের ঘটনার বিষয়ে আমরা জানতে পারি।’
বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে থানায় একটি অভিযোগ করেছে, সেটি আমলে নিয়েই তদন্ত কার্যক্রম চলছে। একজন লোক ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে সাতজনকে জিম্মি করে ফেললো এবং ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার থেকে ২৩ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেলো— এই বিষয়টি যেন কেমন কেমন মনে হচ্ছে। তবে সবদিক বিবেচনা করেই আমরা তদন্ত করছি। আসামি গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
আরও পড়ুন: পিস্তল ঠেকিয়ে ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার থেকে ২৩ লাখ টাকা লুট!








