টেস্টে টেস্টে জেরবার জীবন!

তাসকিনা ইয়াসমিন
২৭ আগস্ট ২০১৮, ১০:২৪আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৮, ১০:৩২

টেস্টের জন্য ল্যাবে রক্ত ও ইউরিনের নমুনা (ছবি- ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

দীর্ঘদিন ধরে জরায়ু সমস্যায় ভুগছেন নাসিমা আক্তার (৪৬)। শেষমেশ কিছু টাকা জমিয়ে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের এই নারী স্থানীয় এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানকার চিকিৎসক তাকে আটটা টেস্ট ধরিয়ে দেন। এসব টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহ করতে চার দিন সময় লাগে তার। খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু ডাক্তার সেই রিপোর্ট ভালোভাবে দেখননি বলেই অভিযোগ করেছেন নাসিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘টেস্টের রিপোর্ট পাওয়ার পর তা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি ভালোভাবে না দেখেই একটা প্রেসক্রিপশন দেন। সে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ খেয়েছি, কাজ হয়নি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ধার-দেনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর বহির্বিভাগে এসে এক ডাক্তারকে আমার জরায়ু সমস্যার কথা জানাই। তিনি আমার আগের টেস্টের কোনও রিপোর্ট না দেখেই নতুন করে আরও দশটা টেস্ট করাতে বলেন। নিরুপায় হয়ে তাও করাই। এবার রিপোর্ট পেতে সময় লাগে তিন দিন এবং খরচ হয় ১২ হাজার টাকা। এরপর রিপোর্ট দেখে ডাক্তার জানান- কোনও সমস্যাই নেই!’ 

সম্প্রতি বিএসএমএমইউ-এর বহির্বিভাগের সামনে কথা হয় নাসিমার সঙ্গে। তার অভিযোগ, ‘এতো টেস্টের কোনও দরকারই ছিল না। নয়তো রিপোর্টগুলো ঠিকঠাক না দেখেই ডাক্তার কেন বলবেন, সব নরমাল! অথচ আমার সমস্যা আছে। এখন আবার কোনও ডাক্তারের কাছে যাবো।’

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও প্রাইভেট চেম্বারে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় টেস্টে তাদের জীবন জেরবার হওয়ার দশা। চিকিৎসকদের কাছে এলেই রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রথমে পরীক্ষা দিতে হয়। সেই পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে লাগে কমপক্ষে দুই দিন। এরপর রিপোর্ট নিয়ে গেলে আবারও পরীক্ষা। এভাবে পরীক্ষা আর রিপোর্ট পেতে কেটে যায় বেশ কিছু সময়। এর মধ্যেই খরচ হয়ে যায় অনেক টাকা। এই টাকা জোগাতে গিয়ে অনেকেরই সর্বশান্ত হওয়ার দশা হয়। এ প্রসঙ্গে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ প্রায় একই রকম।  

জানা যায়, এ বছরের এপ্রিলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা জাহানারা বেগম (৫০)। এসময় তিনি ঢামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগের এক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তখন চিকিৎসক তাকে রক্তের এএফপি (আলফা-ফেটো-প্রোটিন) পরীক্ষা করতে বলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি তা পরীক্ষা করেন বিএসএমএমইউ’তে। এরপর চিকিৎসক তাকে ইউরিন টেস্ট করতে বলেন। সেটাও ঢামেক হাসপাতালের বাইরে থেকে করেন তিনি। ইউরিন টেস্টের রিপোর্ট দেখার পর চিকিৎসক তাকে আরও একটি টেস্ট দেন।

জাহানারা বেগম বলেন, ‘এই ক’মাসে আমার আলট্রাসোনোগ্রাম, ইসিজি, ব্লাড টেস্ট (সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ক্লোরাইড), ব্লাড টেস্ট (সিবিসি অ্যান্ড ইএসআর), ব্লাড (ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ এবং প্লাজমা গ্লুকোজ), ইউরিন, ব্লাড, টিভিএস, এইচপিভি ডিএনএ (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) ছয় বার পরীক্ষা করাতে হয়েছে। পরে জানা গেলো, আমার বড় কোনও সমস্যা নেই। চিকিৎসক কিছু ওষুধ দিয়ে বলেন- এগুলো খেলেই সেরে উঠবো।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হাত ও ঘাড়ের সমস্যা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে আসা জান্নাতুল ফেরদৌস (৫৬)-কে দেখে প্রথমে হাতের এক্সরে করতে বলেন  চিকিৎসক। এক্সরে করানোর পর রিপোর্ট পেতে দু’দিন সময় লাগে। এরপর চিকিৎসকের কাছে রিপোর্ট নিয়ে গেলে তিনি তাকে এমআরআই  করাতে বলেন। এমআরআই  করানোর পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন জান্নাতুল ফেরদৌস। নিউমোনিয়ার চিকিৎসা শেষে চিকিৎসক ফের তাকে আরও একটি পরীক্ষা করাতে বলেন। এ রিপোর্ট দেখানোর পর তার হাতের চিকিৎসা শুরু করেন চিকিৎসক। এ প্রসঙ্গে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘বারবার টেস্ট না দিয়ে চিকিৎসক একবারে  টেস্টগুলো দিতে পারতেন। এতে আমার সময় বাঁচতো। এসব টেস্টেই আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। অবশ্য এখন খুব কম টাকার ওষুধ খেতে হচ্ছে।’

ফরিদপুর থেকে ফুসফুসে সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন সাইদুর রহমান (৬০)। চিকিৎসক প্রথমে তাকে এক্সরে এবং রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেন। এক্সরে এবং রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখার পর চিকিৎসক তাকে সিটি-স্ক্যান করাতে বলেন। পাশাপাশি যক্ষ্মা আছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কফ পরীক্ষা করতেও বলেন। সবগুলো পরীক্ষা শেষে তিনি এখন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করছেন।

সাইদুর রহমানের অভিযোগ, ‘এতো পরীক্ষার দরকার ছিল না। এক্সরে, রক্ত ও কফ পরীক্ষার রিপোর্টে কোনও সমস্যা পাওয়া যায়নি। অথচ এসব পরীক্ষা করাতে আমার অনেক সময় ও টাকা নষ্ট হয়েছে।’

এসব ব্যাপারে হেলথ রাইটস মুভমেন্ট ন্যাশনাল কমিটির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সরকার যদি একটা টোটাল ফ্রেমে না দেখে, তবে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এই অবস্থার পরিবর্তনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবদেশেই সাধারণ রোগের জন্য রোগীরা বেসিক ডাক্তারের কাছে যান। কিন্তু আমাদের এখানে এই সিস্টেম নেই, এটা নেই ভারতীয় উপমহাদেশেই। হাসপাতালে আউটডোরের তো দরকার নেই। কারণ, আউটডোর সবখানে আছে। প্রথমে একজন মেডিক্যাল ডাক্তার দেখে সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেবে। কোথায় চিকিৎসা করাতে হবে, সে জানে। সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে রোগীকে হাসপাতালে পাঠাবে। একইভাবে জরুরি রোগী হাসপাতালে চলে যাবে। এখন আমাদের দেশের চলমান সিস্টেমটা পাল্টাতে তো একটা সিস্টেম দরকার। ঢাকা শহরে ৯৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির কথা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা রোগী দেখবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পলি-ক্লিনিক আছে। আমাদের দেশে এখন যে চিকিৎসা ব্যবস্থা, তা ঠিক ব্যবস্থা না। সরকারিভাবে প্রাইমারি চিকিৎসাটা হতে পারে। এখন দেশে কোনও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনগণ চায় অসুখ হলে চিকিৎসকের কাছে যাবে। কে নিউরো, আর কে অর্থোপেডিক সার্জন–এটা তো তার জানার কথা না। পাবলিক সেক্টরে চিকিৎসার চেয়ে ভোগান্তি বেশি হচ্ছে। এখন স্বাস্থ্যখাতে অনেক বড় বড় কাজ হচ্ছে; কিন্তু ম্যানেজমেন্ট সেক্টরে কিছু হচ্ছে না। পুরো সেক্টরকে একটা চেইনে আনতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিক্যাল অফিসার মারুফুর রহমান অপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই যে রোগী চিকিৎসা নিতে আসার পর একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে, এর জন্য অর্থব্যয় হচ্ছে। এটি সামাল দিতে স্বাস্থ্যবীমাটা খুব জরুরি। স্বাস্থ্যবীমা থাকলে রোগী যেকোনও পরীক্ষার পর অর্থ দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবে না। চিকিৎসকও রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক টেস্টে সীমাবদ্ধ থাকবেন।’

 

/এমএ/এএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম