‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু বঙ্গবন্ধু বা তার পরিবারের সদস্যদেরই নয়, গোটা বাংলাদেশকেই আঘাত করা হয়েছিল। আমরা ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি এখনও অনুসন্ধান করতে পারিনি। অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের শিক্ষাবিদরা এ অভিমত তুলে ধরেন।
শুক্রবার (৩১ আগস্ট) সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। অনুষ্ঠানে মূল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বেনজীর আহমেদ ও শফিক আহমেদ সিদ্দিকি।
অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদরা বলেন, ‘এ দেশের স্বাধীনতা যারা আটকাতে পারেনি, তারাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তারাই প্রতিশোধ নিতে বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল। এ ষড়যন্ত্র চলেছে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় থেকেই।’
অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য ও তার আত্মীয়-স্বজনকে কেন হত্যা করা হয়েছিল, ১৫ আগস্টেই কেন হত্যা করা হয়েছিল তার অনেক কারণ রয়েছে। যারা হত্যা করেছে আমরা তাদের কয়েকজনের নাম জানি। কিন্তু তাদের পেছনে কারা ছিলেন তা আমরা অনুসন্ধান করে উঠতে পারিনি। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি আমরা এখনও অনুসন্ধান করতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে একা নয়, স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছে কখন- যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চেয়েছিলেন। যেদিন মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ছিল, সেদিন। সুতরাং ষড়যন্ত্রকারীরা এ দিনকেই এজন্য বেছে নিয়েছিল যে, ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি অনুসারে ভারত হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আর যাতে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে না পারে। কারণ মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবদান, তার প্রতিশোধ নেওয়ার হিংস্র চক্রান্ত তাদের মধ্যে ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত চারজনকেও। এমন হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে কখনও ঘটেনি। এ বিষয়টি আমাদের তলিয়ে দেখতে হবে।’
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী চিত্র তুলে ধরে ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২১ আগস্টের যে হত্যাকাণ্ড তা ১৫ আগস্টেরই ধারাবাহিকতা। এটি আমাদের বুঝতে হবে। তারা (ঘাতক) এখনও সক্রিয়। আমরা যদি সতর্ক না হই তাহলে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা আমরা রক্ষা করতে পারবো কিনা সন্দেহ।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের যারা আসল শত্রু তাদের পরিচয় কখনও উঠে আসছে না। যারা চেয়েছিল এই জাতিকে চিরকালের জন্য ধ্বংস করতে হবে তাদের আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি? স্বাধীনতার বুলি নিয়ে প্রতিদিনই তারা আমাদের সামনে, বিভিন্ন প্রেসে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। বস্তুত বাঙালি জাতি শত শত বছর ধরে পরাধীন ছিল। কখনও ব্রিটিশ, কখনও পাকিস্তানি, কখনও মোগল, কখনও পাঠান, কখনও কর্ণাটকীয় ব্রাহ্মণ সেনবংশীয়দের পরাধীন ছিল। শাসিত, শোষিত, লাঞ্ছিত হয়ে দীর্ঘ পরাধীনতা আমাদের ধমনিতে গোলামির রক্ত প্রবাহিত করে দিয়েছে। আমাদের জাতীয় চরিত্রে গোলামির ধাঁচ। স্বাধীনতা কী তা আমরা এখনও বুঝতে সক্ষম হইনি।’ তিনি বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে ৪০ হাজার পৃষ্ঠার গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়ে লেখা বই আসছে যা থেকে অনেক কিছুই জানা যাবে।
অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড বঙ্গবন্ধুর প্রতি আঘাত নয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আঘাত। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার ইতিহাস পড়তে হবে। প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে।’
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘স্বাধীনতার সময় সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের কলকাতায় খন্দকার মোশতাক মার্কিন কনসাল জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কুমিল্লার জহুরুল কাইয়ুমের মাধ্যমে। তিনি জানিয়েছেন তোমরা যদি শেখ মুজিবকে পাকিস্তানি কারাগার থেকে ছাড়াতে সহায়তা কর তাহলে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করে দেব। কিন্তু বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন বুঝতে পেরে ক্ষমতাহীন মন্ত্রী বানিয়ে রেখেছিলেন তাকে। যেই ষড়যন্ত্র স্বাধীনতার পরেও অব্যাহত ছিল।’
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু হত্যার পেছনে যারা ছিল তাদের বিচার করতে হবে। যদি মরে যাওয়ার পর মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া যায়, তাহলে মরণোত্তর বিচার করাও যাবে।’
খন্দকার মোশতাক সম্পর্কে শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘তার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু জানতেন। তার বিরুদ্ধে যারা ছিল, তাদের তিনি জানতেন, কিন্তু পাশে রাখতেন। আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতেই থাকতাম। বঙ্গবন্ধুকে এ-ও বলতে শুনেছি- মোসতাক ভাই তোমার টুপির মধ্যে কত শয়তান আছে। টুপি খোলো তো দেখি কত শয়তান আছে?








