ফুটপাত, ড্রেন ও সড়ক উন্নয়নের নামে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার গাছ কাটা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হয়নি। কিছু গাছ নিলামে বেচা হলেও অধিকাংশ গাছ বেচার টাকা করপোরেশনের তহবিলে জমা পড়েনি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তবে মেট্রোরেল প্রকল্পে কাটাপড়া গাছ বেচার টাকা করপোরেশনের তহবিলে জমা পড়েছে।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর ঢাকার দক্ষিণে (ডিএসসিসি) মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও উত্তরে আনিসুল হক মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর দুই সিটি এলাকায় নানা উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসসিসিতে গাছ কাটার প্রবণতা তেমন একটা দেখা না গেলেও ডিএসসিসিতে এর চিত্র ছিল ভয়াবহ। সংস্থাটির মিরপুর, উত্তরা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, লালমাটিয়া ও রামপুরা এলাকায় সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেনের উন্নয়ন কাজে শত শত গাছ কেটে ফেলা হয়। কিন্তু এসব এলাকার গাছ বেচার কোনও টাকাই ডিএনসিসির তহবিলে জমা পড়েনি। অভিযোগ উঠেছে, গাছ কাটার অনুমতি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাটার পর বেচে দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছে।
তবে এর বাইরে মেট্রোরেল প্রকল্প, মিরপুরের কালশী সড়ক, শহীদ তাজউদ্দীন সরণি ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বিটাক রাস্তায় নিয়ম অনুযায়ী গাছ কাটা হয়েছে। এসব গাছ বেচার টাকা সংস্থার তহবিলে জমা পড়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনও এলাকার গাছ কাটতে হলে করপোরেশনের অনুমোদন লাগবে। এ জন্য সংস্থার প্রতিটি অঞ্চলে স্থানীয় আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী প্রকৌশলী, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি করে কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি অনুমোদন দিলে গাছ কাটা যাবে। তবে নিলামে গাছ বেচার টাকা করপোরেশনের নির্ধারিত তহবিলে জমা দিতে হবে।
সিটি করপোরেশনের নিজস্ব উন্নয়ন কাজে এ পর্যন্ত যত গাছ কাটা হয়েছে তার মধ্যে মাত্র দুটি সড়ক ছাড়া কোথাও গাছ কাটার অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ফলে গাছ বেচার টাকাও সংস্থার তহবিলেও জমা পড়েনি।
এ ছাড়া মেয়র আনিসুল হক বেঁচে থাকতে একাধিকবার এমন কথা বলেছিলেন, ‘একটি গাছ কাটা হলে তিনটি গাছ রোপণ করা হবে।’ এ কথারও কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি ডিএসসিসি এলাকায়।
ডিএনসিসির প্রকৌশল সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালের দিকে গুলশান, বনানী ও বারিধারার কূটনৈতিক এলাকায় সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সময় বনানী এলাকার অনেকগুলো সড়ক ও ব্লকের ফুটপাত থেকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ গাছ অপসারণে বনবিভাগকে চিঠি দেওয়া হলেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে এসব সড়কের শত শত গাছ কেটে ফেলা হয়। যদিও ডিএনসিসি তা অস্বীকার করছে।
যদিও মেয়র আনিসুল হক বেঁচে থাকতে একাধিকার এমন কথা বলেছিলেন, ‘একটি গাছ কাটা হলে তিনটি গাছ রোপন করা হবে।’ এ কথারও কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি
এ বছরের শুরুতে বিমানবন্দর সড়কের ‘লা মেরিডিয়ান’ হোটেলের পাশ থেকে শুরু করে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। এসব গাছ নিলামে বেচা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
উত্তরার ১ ও ৩ নম্বর সেক্টরের প্রায় প্রতিটি সড়কের অসংখ্য গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের শাহজালাল অ্যাভিনিউ ও ৬ নম্বর সেক্টরের ঈশা খাঁ অ্যাভিনিউয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ শতাধিক গাছ কাটা হয়। এর আগে এই এলাকার ৩, ৫, ৬, ৭ ও ১১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়কের গাছ কাটা হয়। এসব জায়গায় নতুন গাছ লাগানো হয়নি। নিলামেও বেচেনি ডিএনসিসি।
অন্যদিকে, বনানীর খেলার মাঠের পাশে ২৬ নম্বর সড়কটির দুপাশ থেকে অর্ধশতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এছাড়া বনানীর ১১৬ ও ১২৬ নম্বর সড়কেও ড্রেন নির্মাণ করতে অনেক গাছ কাটা হয়। গুলশান-১ থেকে ২ নম্বর সড়ক পর্যন্ত ফুটপাতের উন্নয়ন কাজেও অসংখ্য গাছ কাটা পড়েছে। গুলশান ২ নম্বর চত্বর থেকে পাকিস্তান হাইকমিশন পর্যন্ত রাস্তার বিভাজকে থাকা গাছ কাটা হয়েছে।
একই অবস্থা রামপুরা ব্রিজ থেকে বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল পর্যন্ত সড়কের। এই সড়কের উন্নয়ন কাজের জন্যও বহু গাছ কাটা হয়েছে। এসব এলাকার কোনও গাছ বেচার জন্য কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ফলে এলাকাগুলো থেকে হাজার হাজার গাছ কাটা হলেও এর কোনও তথ্যই নেই ডিএনসিসির কাছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোই গাছ কেটে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণির উন্নয়ন কাজ ও সাতরাস্তা থেকে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং পর্যন্ত সড়কে ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কয়েকশ’ গাছ কাটতে হয়েছে। লালমাটিয়া এলাকার উন্নয়ন কাজে বিভিন্ন সড়কেরও গাছ কাটা হয়েছে। কিন্তু এর তথ্যও নেই ডিএনসিসি’র কাছে।
উন্নয়নকাজে ডিএনসিসিতে কী পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে তার তথ্য চেয়ে সম্প্রতি ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় কমিটির সদস্য ও পরিবেশকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন। তাকে দেওয়া তথ্যমতে, সংস্থাটির উন্নয়ন কাজের জন্য এ পর্ন্ত যত গাছ কাটা হয়েছে এর মধ্যে মাত্র দুটি সড়কের গাছের নিলাম হয়েছে। এ দুটি হচ্ছে ডিএনসিসির ২৪ নং ওয়ার্র বিটাক মোড় থেকে বায়তুল আজিম জামে মসজিদ পর্যন্ত নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ কাজ এবং মহাখালীর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি (মহাখালী পুলিশ বক্স থেকে পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট পর্যন্ত)। এ দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আম, মেহগনী, বটগাছ, দেবদারু, কাবিলাসহ বিভিন্ন উচ্চতার ৬৩টি গাছ কাটতে হয়েছে। এ থেকে ডিএনসিসির তহবিলে জমা পড়েছে ৬৪ হাজার ২০০ টাকা।
অন্যদিকে মিরপুর ১০ নম্বর হতে ১২ নম্বরের বিআটিএর বাসডিপো পর্যন্ত এবং কালশী রোড উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের জন্য ছোট-বড় বিভিন্ন জাতের ৩৭২টি গাছ কাটতে হয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধির উপস্থিতিতেই এগুলো কাটা হয়। এ থেকে ডিএনসিসির তহবিলে জমা পড়ে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টাকা।
এ ছাড়া মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত এবং মিরপুর ১০ নম্বর থেকে তালতলা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির ৭৬টি গাছ কাটা হয়েছে। ২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে এসব গাছ কাটা হয়। এ থেকে সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা পড়েছে ৬২ হাজার টাকা।
সর্বশেষ মেট্রোরেল প্রকল্পে পল্লবী থেকে মিরপুর-১০ নম্বর হয়ে ফার্মগেট হয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত একহাজার ৬৫টি গাছ কাটতে হয়েছে। এসব গাছ বেচে ডিএনসিসি পেয়েছে দুই লাখ টাকা। সব মিলিয়ে উন্নয়ন কাজে কয়েক হাজার গাছ কাটা পড়লেও ডিএনসিসির তহবিলে জমা পড়েছে মাত্র ৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উন্নয়ন কাজের নামে হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন সময় আমরা সভা-সমাবেশ করে এর প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এরপরও গাছ কাটা থামেনি। মেয়র আনিসুল হক বেঁচে থাকতে বলেছিলেন, ‘একটি গাছ কাটা হলে তিনটি গাছ রোপন করা হবে।’ কিন্তু আমরা এর প্রতিফলন দেখিনি। এই গাছগুলো কাটতে দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া কোনও নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। গাছ কাটার জন্য ঠিকাদাররা সিটি করপোরেশনের কোনও অনুমতি নেয়নি। গাছ বেচার টাকাও সঠিকভাবে করপোরেশনের তহবিলে জমা পড়েনি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী গাছ কাটতে হলে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে উন্নয়ন কাজের ব্যাঘাত হয়। সে জন্য তারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গাছ কেটে বিক্রি করে দেন। এ থেকে কর্মকর্তাদেরকে কিছু ভাগ দিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যায়।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের ৫২টি সড়ক সংস্কার করেছে ডিএনসিসি। এ সময় প্রায় ২৩ কিলোমিটার সড়ক, ১৫ কিলোমিটার ফুটপাত ও ২৭ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশন নালা সংস্কার করা হয়। সড়কগুলো সংস্কারের সময় বেশকিছু গাছ কাটা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ থেকে ২০ বছর বয়সী গাছ ছিল। এসব গাছ কাটায় সেক্টরের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ ছিলেন।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক, ৪৯ কিলোমিটার ফুটপাত এবং ২০ কিলোমিটার নালা নির্মাণ করা হয়েছে। এই উন্নয়ন কাজে শত শত গাছ কাটা পড়লেও এর সব টাকা করপোরেশনের তহবিলে জমা পড়েনি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গাছ কেটে বেচে দিয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা উন্নয়ন কাজে কোনও গাছ কাটিনি। তবে ড্রেন নির্মাণের সময় যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো পড়ে গেছে।’
তার এই বক্তব্য অনুযায়ী ড্রেন করতে গিয়ে যেসব গাছ পড়ে গেছে সে গাছগুলোর নিলাম হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সেগুলো বিক্রি করিনি।’
রামপুরা ব্রিজ থেকে বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল, ধানমন্ডির বিভিন্ন সড়ক, লালমাটিয়া, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে গাছ কাটার চিত্র দেখা গেছে। কেটে ফেলা সেই গাছগুলোর বিষয়ে ডিএনসিসি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব এলাকায় আমরা কোনও গাছ কাটিনি।’








