দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় সুন্দরবনের ছাত্তার বাহিনী। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় নিঃশর্ত ক্ষমা পেতে চান তারা। এই বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাশা— সরকার তাদেরকে দস্যু জীবন থেকে মুক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া সুযোগ দেবে। অন্যদিকে এই বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হবে বলে মনে করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি সুন্দরবনের মরণখোলা নদীর কাছে ঘসিংগাড়ি এলাকায় সরেজমিনে গেলে আত্মসমর্পণের এ ইচ্ছের কথা বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের কাছে জানান ছাত্তার বাহিনীর সদস্যরা। তারা আরও জানান, যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মোহসীন-উল হাকিমের দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর তারা দস্যুতা ছাড়তে সম্মত হয়েছেন।
বাহিনীর প্রধান ছাত্তার জানান, তাদের বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা ১২ জন। তারা হলেন— ছাত্তার (বাহিনী প্রধান), কিবরিয়া, গোলাম, অলি, মাসুম, আকাশ, লোকমান (ভাণ্ডারি), রবিউল, শওকত, নাহিদুল ও অহিদ। তাদের কাছে এইট শ্যুটার, পয়েন্ট টুটু, দোনালা ও একনালা বন্দুক রয়েছে ১৩টি। এছাড়া, গুলি রয়েছে প্রায় চারশ’ রাউন্ড।
এই বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়ে যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মোহসীন-উল হাকিম বলেন, ‘আগে যে বাহিনীগুলো আত্মসমর্পণ করেছে, তাদেরই ধারাবাহিকতায় সাত্তার বাহিনীর সদস্যরাও আত্মসমর্পণ করতে চান। এরা নানা কারণে দলছুটদের সম্মিলিত একটি দল। এই লোকগুলো একত্রিত হয়ে সুন্দরবনে দস্যুতা করছিল। সুন্দরবনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটাই সবচেয়ে বড় বাহিনী। আগের আত্মসমর্পণগুলোর ধারাবাহিকতায় তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। তখন আমি তাদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেই। তারা আমার প্রস্তাবে আত্মসমর্পণের জন্য সম্মতি জানিয়েছেন।’
আত্মসমর্পণে সম্মতি জানিয়ে সর্বশেষ বড় দুস্য বাহিনীর প্রধান ছাত্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনে চলা এখন দুষ্কর। সব জায়গায় ক্যাম্প রয়েছে। কোস্ট গার্ডের ক্যাম্প, র্যাবের অভিযান, এভাবে চলা যায় না। তার মধ্যে আল্লাই বাঁচিয়ে রেখেছে। এই জীবন ভালো না, খুবই খারাপ। সাধারণ ক্ষমা চাই আমরা। আমাদের অস্ত্র, গুলি যা কিছু আছে, স্বরাষ্টমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়ে সাধারণ জীবনে ফিরে যেতে চাই। তারপর যেন আমরা ভালোভাবে থাকতে পারি এটাই চাওয়া।’
ছাত্তার বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হবে। এতে স্থানীয় জেলেরা নিরাপদে সুন্দরবন ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে পারবে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে সরকার সচেষ্ট থাকলে এই অবস্থা পরবর্তিতেও বজায় থাকবে বলে মন্তব্য করেন ছাত্তার।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখা ও জেলেদের চলাচল নিরাপদ করার জন্য ব্যবসায়ীদের চেক দিতে হবে বলে জানান ছাত্তার। তার দাবি, ‘ব্যবসায়ীদের থেকেই ডাকাতের জন্ম হয়, যেমন— বায়েজিদ আমারে ডাকাত বানাইছে। আমার সামনে অন্য ডাকাতরে অস্ত্র আইনা দিছে। আমি সে সময় থেকে তারে জানি। এরপর বাবলু আছে। অনেক অস্ত্র আইনা দিছে। কিন্তু মানুষ জানে না। আগে ব্যবসা করলেও এখন চাপা দিছে। আমারে অস্ত্র দিছে বাবলু ডাকাত।’
ডাঙ্গায় বাঘ, পানিতে কুমির, এছাড়াও আছে প্রশাসনের ভয়। এত ভয়ের মধ্যে সুন্দরবনে দস্যুতা করতে চান না বলে জানিয়েছেন ছাত্তার বাহিনীর অন্যতম সদস্য লোকমান (ভাণ্ডারি)। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে কাজ কাম করে ভালোভাবে চলতে চাই। এ জীবন কোনও জীবন না। এ জীবনের থেকে কষ্টের আর কিছু নেই। ডাঙ্গায় বাঘ, পানিতে কুমির, প্রশাসনের ভয়। জেলে ছিলাম ভালো ছিলাম। এই ডাকাতের যন্ত্রণায় আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিছিলাম। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে ভালো হতে চাই।’
যারা এখনও দস্যুতা করে বেড়াচ্ছে তাদের উদ্দেশে ভাণ্ডারি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস তারা সুন্দরবনে থাকতে পারবে না। সে যতবড় ডাকাতই হোক না কেন, যত অস্ত্র গুলিই থাকুক না কেন। সুন্দরবনে কোনও ডাকাত থাকতে পারবে না।’
‘এ জীবন (দস্যু জীবন) কোনও জীবন না। এ জীবন ভালো না। এ জীবনে এসে কেউ বাঁইচা থাকতে পারবে না।’ যোগ করেন ছাত্তার।
বাহিনীর আরেক সদস্য মাছুম, কিভাবে দস্যুতায় এসেছেন সে সম্পর্কে বলেন— ‘কাজের জন্য আমাদের সুন্দরবনে আসা হয়। এরপর এসে জলদস্যু হইছি। যখন নাম লিখাইয়া ফেলছি, তখন তো আর দেশে ওঠার (লোকালয়ে ফিরে আসা) কায়দা নাই। দেশে উঠলে প্রশাসনের প্রচুর পরিমাণে ঝামেলা। ভাই (সাংবাদিক মোহসীন) বললো সারেন্ডারের একটা সুযোগ আছে। তোমরা সবাই সারেন্ডার করো। তারপরে আমরা এখন সারেন্ডারে যাচ্ছি। এখান থেকে গিয়ে আমরা বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে আছে, তাদের নিয়ে যেন সুখে থাকতে পারি। সরকার যেন আমাদের সেরকম একটা ভালো নিশ্চয়তা দেয়। ভালো থাকার মতো পরিবেশ করে দেয়।’
সুন্দরবনের দস্যু বা ডাকাতদের জীবন কোনও জীবন নয় উল্লেখ করে মাসুম বলেন,‘ডাকাতি করে টাকা কামানো যায়। কিন্তু দেশে থাকা বাপ-মায়ের মুখ দেখতে পারি না। দেশে যাইতে পারি না। এখন বাপ-মা যদি এক্সিডেন্ট করে তাও যাওয়ার কোনও উপায় নাই। কারণ, কোনও পরিবেশ নাই। ২৪ ঘণ্টাই আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। এখানে প্রশাসন আছে, অন্য ডাকাত আছে— তারা হঠাৎ করে আক্রমণ করে কিনা? জঙ্গলে টাইগার আছে, তারা পেছন থেকে আক্রমণ করে কিনা? আমাদের জঙ্গলে ডিউটি করতে হয় রাতে। এই আতঙ্কের মধ্যে আর থাকতে চাই না। পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চাই।’
সুন্দরবনে থাকা ছাত্তার বাহিনীসহ আরও ছোটখাটো দস্যুদের আত্মসমর্পণের আরেকটি সুযোগ দিতে চান বলে জানিয়েছেন র্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রায় সব দস্যু বাহিনী আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এখন যেসব ক্ষুদ্র বাহিনী আছে, তাদেরকে আমরা আরও একটি সুযোগ দিতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আগে যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তারা এখন ভালোই আছে। রাষ্ট্র তাদেরকে পুনর্বাসনের জন্য সহযোগিতা করছে। যারা এখনও এই পথে আছে, তারা বুঝতে পেরেছে এই ফেরারি বা দস্যু জীবন ভালো না। তারা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য আমাদের কাছে অ্যাপ্রোচ করেছে। উই আর ট্রায়িং।’
ছবি ও ভিডিও: রাফসান জানি








