পথচারী, গাড়িচালক, ছাত্রীদের গায়ে-মুখে পোড়া মোবিল লাগানো ও কানধরে ওঠবোস করানোর কর্মকাণ্ডকে ফৌজদারি অপরাধ-সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, এই ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারা এও বলছেন, কেউ অভিযোগ দায়ের না করলেও এই ধরনের অপরাধীদের আটক করে আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত। দণ্ডবিধি ও নারী নির্যাতন দমন আইনে এই অপরাধীরেদ বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সোমবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তারা এমন অভিমত জানান।
রবি ও সোমবার ধর্মঘট চলার সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাত্রী, চালক ও পথচারীদের মুখে পোড়া মোবিল লাগানোসহ কান ধরে ওঠবোস করিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। এ সময় ছাত্রীদের গায়ে হাত দিয়ে পোড়া মোবিল দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অনেক প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসচালকদের গাড়ি থামিয়ে তাদের কান ধরে ওঠবোস করানো হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন মানুষকে পথে লাঞ্ছিত করা হবে, তার বিচার হবে না, এটা হতে পারে না। কারও চলাফেরায় কেউ বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে না। এটা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হয়। কারও সাংবিধানিক অধিকার কেউ খর্ব করতে পারে না।’
মানুষের মুখে পোড়া মোবিল লাগিয়ে দেওয়া ও কান ধরে ওঠবোস করানোর বিচারের জন্য আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘মানহানির অভিযোগ এনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা বা মোকদ্দমা করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘ভুক্তোভোগীরা ফৌজদারি আদালতে মানহানির মামলা করার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। সে অভিযোগ শুনে আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমন জারি করতে পারেন। তবে মানহানির মামলায় সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় না। সমন দেওয়ার পর যদি কোনও ব্যক্তি আদালতে হাজির না হন, সে ক্ষেত্রে বিচারক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।’
এদিকে সড়কে ছাত্রীদের হয়রানির ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট জীবনানন্দ জয়ন্ত। তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীকে যেভাবে পোড়া মোবিল তার গায়ে লেপে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। এই অপরাধে নারী নির্যাতন দমন আইনে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। ভুক্তোভোগী অভিযোগ না করলেও পুলিশের উচিত নিজে থেকে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা।’
জীবনানন্দ জয়ন্ত আরও বলেন, ‘ঢাকা মহানগরী পুলিশ অধ্যাদেশ-১৯৭৬-এর আওতায় পুলিশ এসব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। পুলিশ এ ধরনের কাজ নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতা রাখে।’
রবিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় বিভিন্ন গাড়িচালক ও যাত্রীদের মুখে পোড়া মোবিল দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় স্কুল ও কলেজের ছাত্রীদের গায়ে পোড়া মোবিল দিতেও দেখা যায়। তবে এসব ঘটনায় এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াজেদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারও চলাচলে কেউ বিঘ্ন ঘটাতে পারে না। আমরা শুনেছি কারও কারও মুখে পোড়া মোবিল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে, আমরা সরাসরি কাউকে পাইনি। এ বিষয়ে কেউ আমাদের কাছে অভিযোগও করেনি।’
কেউ অভিযোগ না করলে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে কিনা?—জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘অবশ্যই সুযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা আন্দোলন করে, গাড়ি চালাচ্ছে না, এটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু তারা অন্যকে কোনও কাজে বাধা দিতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘যারা সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে, মানুষকে হেনস্থা করেছে, অবশ্যই আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
তবে গত দুদিনে সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য সোমবার রাত পর্যন্ত কোথাও কোনও মামলার খবর পাওয়া যায়নি।








