চাহিদাপত্র সত্যায়ন ছাড়াই সেই ৬৩ শ্রমিককে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়!

সাদ্দিফ অভি
০২ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:৫৬আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৮, ০৪:০০





চাহিদাপত্র সত্যায়ন ছাড়াই সেই ৬৩ শ্রমিককে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়!

চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) সত্যায়ন ছাড়াই মালয়েশিয়ার গ্লাভস প্রস্তুতকারক কোম্পানি সুপারম্যাক্সে কাজের জন্য ৬৩ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে গত ১১ অক্টোবর সেদেশে পাঠানো হয়। কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন বিভাগ তাদের দুই দিন পর দেশে ফেরত পাঠায়।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক সূত্রে জানা যায়, যে কোম্পানিতে কাজের জন্য তারা গিয়েছিলেন সেখান থেকে কেউ তাদের নিতে আসেনি। দুদিন কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে অবস্থান করার পর তাদের কলিং ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর তাদের দেশে ফেরত পাঠায় দেশটির ইমিগ্রেশন পুলিশ।
তবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সুপারম্যাক্স থেকে যে চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছিল তা মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সত্যায়িত ছিল না।
মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই মালয়েশিয়ার গ্লাভস প্রস্তুতকারী কোম্পানি সুপারম্যাক্সে নিয়োগ পান। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় ৩০ আগস্ট। এরপর ১০ অক্টোবর তারা পাসপোর্ট হাতে পান। তাদের ফ্লাইট নির্ধারিত হয় ১১ অক্টোবর। ওই দিন তারা মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। কিন্তু এয়ারপোর্টে তাদের কেউ নিতে আসেনি। ১৩ অক্টোবর রাতে তারা দেশে ফেরত আসেন।
তবে এজেন্সিগুলো সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে আবার তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠাবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা দেশেই আছেন। কয়েকজন কিছু টাকা ফেরত পেলেও বাকিরা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
জুয়েল নামের এক শ্রমিক বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় কাজে যাওয়া বাবদ এজেন্সিকে দালালের মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিছিলাম। কিন্তু ফিরে আসার পর এজেন্সির কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা ফেরত পেয়েছি। বাকি এক লাখ টাকা আমার দালাল ফেরত দেবে বলছে।’ দালাল কবে ফেরত দেবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দালাল আমার সম্পর্কে আত্মীয় হয়, সে বলছে টাকা দিয়ে দেবে।’
দেশে ফিরে আসা আরেক শ্রমিক নাসির এখন পর্যন্ত কোনও টাকাই ফেরত পাননি। তবে তার এজেন্সি প্রথমে ১০দিন সময় চাইলেও পরে আরও সময় নিয়েছে বলে জানান তিনি। দুই দিন আগে তিনি জানতে পেরেছেন, আগামী সপ্তাহে আবার ভিসা হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ৬৩ জনকে মালয়েশিয়ার ৪৬টি এজেন্সি নিয়োগ দেয়। তাদের সবার পাসপোর্ট ও জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার ৪৬টি কোম্পানির নামে ভিসা অনুমোদন ও ব্যুরো থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে।
শ্রমিকদের ভাষ্য, তারা ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যান। কিন্তু তাদের বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয় বারাকাত ডায়নামিক ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, বিপ্লব ইন্টারন্যাশনাল ও ওভারসিজ সাপোর্ট লাইন— এই তিনটি কোম্পানির নামে।
মালয়েশিয়া থেকে আসা চাহিদাপত্রে ৭৫ জনের তালিকা রয়েছে। কিন্তু এই চাহিদাপত্র দূতাবাস থেকে সত্যায়িত হয়ে আসেনি। এ কারণে কুয়ালালামপুরের ইমিগ্রেশন পুলিশ দ্বিধায় পড়ে যায়, চাহিদাপত্র আসল নাকি নকল। এই ৬৩ জনকে নিয়ে যাওয়ার পরদিন কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে সেদেশের নিয়োগকারী এজেন্সির একজন প্রতিনিধি এসে চাহিদাপত্রের সঙ্গে পাসপোর্ট মিলিয়ে দেখে। কিন্তু কিছু একটা সমস্যা পাওয়ায় তিনি ‘প্রব্লেম’ বলে এয়ারপোর্ট থেকে চলে যান। এরপর ইমিগ্রেশন পুলিশ এই ৬৩ জনকে এয়ারপোর্টে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে এই সংক্রান্ত একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সুপারম্যাক্সের নামে পাঠানো চাহিদাপত্র হাই কমিশন সত্যায়িত করেনি। তাই বিষয়টি এরই মধ্যে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কর্মসংস্থান) ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে বিএমইটিকে বলা হয়েছে। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে।’
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা তদন্ত করছে বিএমইটি। তারা কীভাবে গিয়েছিলেন, কাদের মাধ্যমে গিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখছে। যারা ফিরে এসেছে তাদের অনেকেই টাকা ফেরত পেয়েছেন। এজেন্সিগুলো বায়রার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা হয় তাদের আবার নিয়ে যাবে, না হলে টাকা ফেরত দেবে। আমরা চাই শ্রমিকরা যেন ক্ষতির মুখে না পড়েন।’
তিনি বলেন, ‘তারা সত্যায়িত ছাড়া গেছেন কিনা, এটা মন্ত্রণালয় দেখেছে। যাদের শোকজ করার তাদের শোকজ করেছে। যদি এমন কাজ করে থাকে তাহলে তাদের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। যদি অন্য উপায়ে ইমিগ্রেশন করায় থাকে তাহলে ইমিগ্রেশন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে চাহিদাপত্র সত্যায়নের ঝামেলা এড়াতে চায় মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। তাই কর্মী নিয়োগের আগেই চাহিদাপত্র সত্যায়নের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার শর্ত দেয় মালয়েশিয়ার সরকার। কিন্তু সত্যায়ন ব্যবস্থা তুলে দিলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভুয়া চাহিদাপত্র দিয়ে প্রতারণার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা মালয়েশিয়ার সঙ্গে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে জানানো হয়। পরে আলোচনার ভিত্তিতে সত্যায়ন ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান বলেন, ‘কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাই কমিশনে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্রে সত্যায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এ ব্যাপারে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে।’

 

/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম