ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতিই বাংলার মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় নিরুৎসাহিত করেছে এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করেছে।ফলে সৃষ্টি হয়েছে ধর্মভিত্তিক পরিচয়ের প্রাধান্য ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন। শনিবার (১৭ নভেম্বর) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে এসব কথা বলেন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং স্কলার ড. তাজীন মুরশিদ।
রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “বাংলায় মুসলমান বুদ্ধিজীবী সমাজের বিকাশ” শীর্ষক এক গণবক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘ঊনিশ শতকের শেষদিক নাগাদ ব্রিটিশরা মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক স্বার্থ হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলে। ‘ভারতের বিচিত্র জাতিগোষ্ঠী এবং একটা শক্তিশালী মুসলমান সম্প্রদায়ের উপস্থিতি’কে নিঃসন্দেহে ‘আমাদের শাসনের জন্য সুবিধাজনক’ পরিস্থিতি হিসেবে দেখেন ডাফরিন।
১৮৭২ সালের আদমশুমারি এবং ১৯০৯ সালের পৃথক নির্বাচনব্যবস্থায় ভারতীয়দের ধর্মীয় পরিচয়ে শনাক্ত করার মাধ্যমে ভারতীয়দের সম্প্রদায় হিসেবে দেখা এবং তাদেরকেও একইরকম ভাবতে শেখানোর কাজ চূড়ান্ত হয় মন্তব্য করে ড. তাজীন বলেন, বাজেট স্বল্পতার অজুহাতে পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর উৎসাহদানের বিপরীতে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে ‘অফিসিয়াল’ আপত্তি আসলে কোনও গুরুত্ব বহন করত না। মাদ্রাসা ও মক্তবগুলোতে প্রদত্ত পৃথক শিক্ষা ব্রিটিশদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। কারণ, তা ছিল মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় সুদৃঢ়করণ এবং তাদের নিজেদেরকে পৃথক সম্প্রদায় হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত করার জন্য একটা প্রয়োজনীয় কৌশল।
ড. তাজীনের মতে, তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা হিন্দু মধ্যবিত্তের সঙ্গে নানামুখী প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ হয়েছে। বিশেষ স্বার্থে আচ্ছন্ন রেখে মুসলমানদের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ থেকে দূরে রাখা হয়। অন্যদিকে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আবির্ভূত হয় হিন্দু ধর্মের প্রতীকরূপে, যা ছিল মৌলিকভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরোধী।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে গবেষক ড. গোলাম মুরশিদ বলেন, ইংরেজি ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ ও ‘ইন্টেলিজিন্সিয়া’ শব্দের মধ্যে তাৎপর্যগত পার্থক্য রয়েছে। ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ সাধারণ অর্থে শিক্ষিত শ্রেণিকে বোঝায়। ‘ইন্টেলিজিন্সিয়া’ শব্দের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার সম্পর্ক রয়েছে। যারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকাঠামোর বিরোধিতা করেন, তাদেরকেই ‘ইন্টেলিজিন্সিয়া’ বলা যায়। উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে এর কোনোটাই সৃষ্টি হয়নি। আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন ব্যতিক্রম। ব্রিটিশদের মাদ্রাসা শিক্ষাকে পৃষ্ঠপোষণের নীতি ছিল তা ঠিক, তবে মুসলমানরাও তা সমর্থন করেছে। তারা চেয়েছিল মুসলমানি বাংলা শিখতে। এমনকি বিশ শতকের মুসলমান নেতা ফজলুল হক, স্যার আবদুর রহিমও তা সমর্থন করেছেন। বিশ শতকে সওগাত গোষ্ঠী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিখা গোষ্ঠী’র মাধ্যমেই মুসলমান সমাজে প্রথম ইন্টেলিজিন্সিয়ার উদ্ভব হয়েছে।








