‘জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করতে হলে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করতে হবে। শুধু রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে থাকলে হবে না। বাবা-মা থেকে পরিবার বা সমাজ; প্রত্যেক স্তরের লোকজনকেই জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ মসজিদ-মাদ্রাসা বা পাঠ্যপুস্তকেও জঙ্গিবাদবিরোধী ভাষ্য যুক্ত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে চিন্তা ও চেতনায় মননশীল হতে হবে।’
শনিবার (২৪ নভেম্বর) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের আয়োজনে ‘সহিংস উগ্রবাদবিরোধী যুব সংলাপে’ আলোচকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এসব কথা।
সিটিটিসির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামের সঞ্চালানায় এই সংলাপে অংশ নেন ঢাকার একাধিক স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া, অতিথি হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন– ইউএনডিপির প্রতিনিধি রবার্ট স্টোরম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও উপস্থাপক শবনম আজীম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারজানা রহমান, ডিবিসি নিউজের সম্পাদক নবনীতা চৌধুরী ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। পুরো সংলাপটি কো-অর্ডিনেট করেন সিটিটিসির উপ-কমিশনার আব্দুল মান্নান।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ইউএনডিপির প্রতিনিধি রবার্ট স্টোরম্যান বলেন, ‘জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদের চালিকাশক্তি কারা তা চিহ্নিত করতে হবে। এজন্য সমাজের সব স্টেক হোল্ডারদের এগিয়ে আসতে হবে।’
সংলাপে অংশ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বলেছেন, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে একদল বিপথগামী তরুণ জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এর কারণ হলো ধর্মের সঠিক শিক্ষার অভাব, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন। বিভিন্ন কারণে হতাশ তরুণদের সহজেই জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করা যায়। এ ছাড়া, ইন্টারনেটে বিভিন্ন গুজব এবং উগ্রবাদী কন্টেন্ট ছড়িয়ে তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে শীর্ষ জঙ্গিরা। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক তরুণ জানে না। ধর্ম সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেই তরুণদের। এ কারণে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা সহজেই তাদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে। অনেক তরুণ আবার অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় জঙ্গিবাদে জড়ায়। সামাজিক ন্যায়বিচার না পেয়ে অনেক তরুণ বিপদপামী হচ্ছে বলেও তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।
ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সুলতানা চামেলি তার মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘জঙ্গিরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের মতবাদ প্রচার করছে। সেখানেই তারা নানা ধরনের গুজব বা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে থাকে। একারণে ইন্টারনেটকেন্দ্রীক তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’
নিজের এক স্বজনের উদাহরণ টেনে চামেলী বলেন, ‘ভিডিও গেমস খেলে, অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে করতে এক শিশু স্কুল এবং পরিবারের সদস্যদের দেখলেই গুলি করতে চায়। এর অর্থ হলো তার মেধা ও মননে অস্ত্র দিয়ে গুলি করাটা ঢুকে গেছে। সে তো বড় হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে। এসব বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
শামসুদ্দিন নামে লালবাগ মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সবার মধ্যেই ধর্মীয় বিষয়ে দুর্বলতা কাজ করে। জঙ্গিরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। অনেকেই ধর্মীয় বিষয়ের প্রকৃত ব্যাখ্যাটা না বুঝেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। অথচ ইসলাম কখনোই জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না।’
বাকি বিল্লাহ নামে কবি নজরুল সরকারি কলেজের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ধর্মীয় বিষয়ে পরিবার থেকে সঠিক শিক্ষা পেলে কেউ জঙ্গিবাদে জড়াবে না। শুধু পরিবার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আফরিন লায়লা বলেন, ‘স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার লক্ষণগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে একজন তরুণের আচরণ দেখে বোঝা যায় সে বিপথগামী হয়েছে। তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক বা অভিভাবকরাই তাকে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনতে পারবে।’
মধ্যপ্রাচ্যসহ দুনিয়াজুড়ে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পর এখন অনেক দেশই নানা কৌশলে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপারেশন বা ‘হার্ড পলিসি’র বদলে অগ্রিম প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ‘সফট পলিসি’র দিক নজর দিচ্ছে অনেক দেশ। সেই ধারাবাহিকতায় জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ইউএনডিপির সহায়তায় এই যুব সংলাপের আয়োজন করেছে সিটিটিসি। অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে একজন ব্যক্তি কেন জঙ্গিবাদে জড়ায় এবং প্রতিরোধের ব্যবস্থা কী হতে পারে, সেই সম্পর্কে মতামত নেওয়া হয়। এসব মতামত ভবিষ্যত কৌশল নির্ধারণে প্রয়োগ করা হবে বলেও জানান সিটিটিসির কর্মকর্তারা।
সংলাপে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইরফান তুলে ধরেন ঢাকার অপ্রতুল বিনোদন ব্যবস্থার চিত্র। তিনি বলেন, ‘শিশুদের বিনোদনের কোনও ব্যবস্থা নেই। খেলাধুলার জন্য কোনও মাঠ নেই। তারা এখন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের মধ্যে ডুবে থাকছে। এসব কারণে অনেক শিশু ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের সহজেই জঙ্গিরা উদ্বুদ্ধ করছে।’
অনুষ্ঠানে তরুণ সাংবাদিক হিসেবে মতামত তুলে ধরেন নিউএজ’র মুক্তাদির রশিদ রোমিও, বিডিনিউজের গোলাম মুজতুবা ধ্রুব, চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের রাশেদ নিজাম, একাত্তর টিভির নাদিয়া শারমিন, সময় টিভির খান মুহম্মদ রুমেল, যমুনা টিভির আব্দুল্লাহ তুহিন, গাজী টিভির জামশেদ নাজিম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির আসিফ সুমিত প্রমুখ।
তরুণদের বক্তব্যের পর সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তরুণরা তাদের বক্তব্যে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন। ধর্মের অপব্যাখ্যা, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন এবং আত্মীয়তার বন্ধনের অভাবের কথা বলেছেন। এসব বিষয়ের বাইরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা রয়েছে। অনেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতির কথা বলেছেন। আমরাও বলছি, তরুণ প্রজন্মকে মননশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চিন্তা চেতনায় মননশীল কেউ জঙ্গিবাদে জড়াতে পারে না। কেননা, তিনি অন্যের মতের প্রতি সহনশীল হন।’
তিনি আরও বলেন, ‘জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তরুণ-যুবকরাসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।’








