রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে গঠিত বাস রুট রেশনালাইজেশনকে অথরিটির মাধ্যমে পরিচালনার কথা বলছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কমিটি দিয়ে কোনও ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের চেয়ে অথরিটি বা কর্তৃপক্ষ দিয়ে সেই উদ্দেশ্য সফল করা সহজ। এজন্য বাস রুট রেশনালাইজেশনকে একটি অথরিটিতে রূপান্তরের দরকার রয়েছে। কেননা অথরিটির একটা দায়বদ্ধতা থাকে।
কমিটির সদস্যরাও বলছেন, বিষয়টি তারা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। এজন্য তারা কাজ করবেন। তবে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমিটির চেয়ে অথরিটি ভালো। এজন্য অবশ্যই স্বাধীন, টেকনিক্যাল, গণসম্পৃক্ত ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে অথরিটি করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের উচিত হবে, দেশে যে আইন রয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়ন করা। আইনের প্রয়োগেই সড়কের বিশৃঙ্খলা দূর হবে।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে দায়িত্ব দিয়ে যে দুটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে তাতে মেয়রকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও কোনও ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। আর এই কমিটিগুলো যদি অথরিটি বা কর্তৃপক্ষে রূপান্তর করা যায় তাহলে তাতে আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের বিষয়গুলো থাকবে। তখন পরিবহন চালক থেকে শুরু করে এর যাত্রীরাও আইন মানতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু কমিটি যতই কাজ করুক তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এর সফলতায় সন্দেহ রয়েছে। কমিটি করে শুধু কাউকে দায়িত্ব দিলেই হবে না বরং তা কার্যকর করার জন্য ক্ষমতাও দিতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কমিটির ক্ষমতা কী আমরা কিছুই জানি না। যখনই দুই-চারটা দুর্ঘটনা ঘটে তখন সরকার একটা কমিটি করে দেয়। বাংলাদেশে কয়টি কমিটি আছে তা সরকার নিজেও জানে না। তার মানে, তুমি চিৎকার করতেছো তোমার মুখের ভেতরে একটা ললিপপ দিয়ে দেওয়া, যাতে তুমি আর চিৎকার করতে না পারো। এটাই হচ্ছে কমিটি। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অসংখ্য অথরিটি আছে। কিন্তু অথরিটি কি কাজ করে? ট্রাইব্যুনাল অথরিটি এবং কমিটি কিছুই কাজে আসবে না যদি আইনি ক্ষমতা না দেওয়া হয় এবং তার প্রয়োগ না করা হয়।’তার মতে, কমিটি মানেই হচ্ছে সরকারি কিছু লোক।
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের দায়িত্ব দিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ১০ সদস্যের এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে। প্রজ্ঞাপনে বেশ কয়েকটি দায়িত্বের কথা বলা হয়। দায়িত্বগুলোর মধ্যে, ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তনের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মাধ্যমে বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তন এবং এ পদ্ধতি প্রবর্তনে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এছাড়া এসব বিষয়ের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য কার্যক্রমসহ কমিটির কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করার কথাও বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে যানজটের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা। এছাড়া রাস্তার স্বল্পতা, সমন্বয়হীন রুট পারমিট, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চলাচল, অপ্রশস্ত সড়ক, বেপরোয়া বাস-মিনিবাস, যত্রতত্র ট্রাকস্ট্যান্ড, রেলগেট, মিনিবাস ও মাত্রাতিরিক্ত হিউম্যান হলার যানজটকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। অপরদিকে বছরজুড়ে সেবা সংস্থাগুলোর খোঁড়াখুঁড়ি, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে অনীহা ও রাস্তাজুড়ে আবর্জনার কনটেইনার দুঃসহ যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি পার্কিংবিহীন বহুতল ভবন, অটো সিগন্যালের অভাব, রাস্তার ওপর বাস টার্মিনাল, একমুখী রাস্তায় ডিভাইডার, যত্রতত্র হকার্স মার্কেট-কাঁচাবাজার গড়ে তোলাসহ ভাঙাচোরা রাস্তা যানজটকে দীর্ঘায়িত করছে। কিন্তু এসব বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হলেও বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি কমিটিকে। আর কোনও কমিটিকে ক্ষমতা দেওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষমতা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে কমিটির আহ্বায়ক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এজন্য কাজ করছি। অদূর ভবিষ্যতে এটাকে অথরিটি করা যায় কিনা সে বিষয়েও কাজ করবো। তবে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কমিটির বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করতে পারি। বিষয়গুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছে দিতে পারি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা অথরিটির মাধ্যমে পরিচালনা করা হলে ভালো হবে। কারণ অথরিটির একটা দায়বদ্ধতা থাকে। আমরা চাই অথরিটির মাধ্যমে পরিচালিত হোক। বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে কমিটির আহ্বায়ক মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমরা একমত।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন সংক্রান্ত যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে তার কাজগুলো ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির (ডিটিসিএ) মাধ্যমে করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কমিটির প্রধানসহ অন্যরা বিষয়টি তদারকি করতে পারেন। এজন্য নতুন করে অথরিটির দরকার নেই।’
তিনি বলেন, ‘গণপরিবহন সমন্বয় করার জন্য ডিটিসিএ রয়েছে। এর কাজই হচ্ছে গণপরিবহনের যেকোনও সমস্যার টেকনিক্যাল সমাধান করা। এখন আমাদের একটা কালচার হয়ে গেছে, যে সমস্যার সমাধান যার কাছে আছে তার কাছে না গিয়ে আমরা অন্যের কাছে চলে যাই। আমি মনে করি, কমিটি দিয়ে কোনও সমস্যার সমাধান হবে না। এটা অথরিটির মাধ্যমেই করতে হবে।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থা কেমন হবে তা স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে (এসটিপি) রয়েছে। তবে এটাকে দেখভাল করার জন্য পুরো পৃথিবীতে এ সংশ্লিষ্ট লোকের সমন্বয়ে গণপরিবহন কর্তৃপক্ষ নামে একটি স্বাধীন অথরিটি থাকে। আমাদের সেটা আগে তৈরি করতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে সমন্বয় এবং পরিবহনগুলো যাত্রীদের সঠিক সেবা দিচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি যাত্রীরা যাতে এক টিকিটে বাস, রেল এমনকি লঞ্চে যাতায়াত করতে পারেন তারও ব্যবস্থা করা। এজন্য মাস ট্রানজিট অথরিটি থাকা দরকার। তাহলেই কার্যকর ও টেকসই হবে। তা না হলে উদ্যোগ- উদ্যোগই থেকে যাবে, কার্যকর হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে অথরিটি করা হবে সেটি অবশ্যই স্বাধীন, টেকনিক্যাল, গণসম্পৃক্ত ও পেশাদারিত্ব সম্পন্ন হতে হবে। তাহলেই আমরা একটা সুন্দর, সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা পাবো।’








