বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য আটকে আছে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড হওয়ায় খালেদা জিয়া বর্তমানে ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
নিরাপত্তা ও অসুস্থতাজনিত কারণে খালেদা জিয়াকে এই কারাগার থেকে কোথায় স্থানান্তর করা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারটির উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও শুরু করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই মাস আগেই পুরনো কারাগার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়াকে কোথায় স্থানান্তর করা হবে— তা নিয়ে এখনও দোটানা থাকায় কাজ শুরু হয়নি। আবার তাকে এখানে রেখে কাজ শুরু করাটাও নিরাপত্তাজনিত হুমকি হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। একারণে আগামী বুধবার (৯ জানুয়ারি) প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষের।
যোগাযোগ করা হলে কারা অধিদফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা শিগগির পুরাতন কারাগারের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ এই কাজ শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ‘পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এ অনুমোদিত হয়। ৬০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি জোনে ভাগ করে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী ‘এ’ জোনে মাল্টিপারপাস হল, কনভেনশন সেন্টার, সিনেপ্লেক্স, খাবার ঘর, সুইমিং পুল এবং অন্যান্য সুবিধাদিসহ গাড়ি পার্কিং, ওয়াটার বডি, ব্যাংক স্থাপন করা হবে। ‘বি’ জোনের আওতায় বুক স্টোর, ফুলের দোকান, ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং, বিদ্যমান ওয়াটার বডি সংযুক্ত করা হবে। ‘সি’ জোনের আওতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর, জাতীয় চার নেতা কারা স্মৃতি যাদুঘর, কনফাইন্ড হেরিটেজ, উদ্যান ইত্যাদি করা হবে।
সূত্র জানায়, পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের উত্তর দিকের লাগোয়া ভবনগুলো ভেঙে নতুন করে উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পের কাজ তিনটি ভাগে ভাগ করে এ জোনে সাড়ে তিন একর, বি জোনে এক একর ৪০ শতাংশ এবং সি জোনে ১৭ একর ভূমি ব্যবহৃত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (প্রশাসন)সভাপতি এবং স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান স্থপতি ও কারা মহাপরিদর্শককে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত সচিবের বদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে কো-অপ্ট সদস্যসহ মোট ১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-এর সহায়তায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ডিজাইন আহ্বান করা হয়েছিল। এতে ৯৮টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করলেও শেষে ৩৪টি ডিজাইন জমা পড়েছিল। ডিজাইনগুলো পর্যালোচনার পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গঠিত জুরি বোর্ড ফর্ম-থ্রি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনকে চূড়ান্ত নির্বাচিত করে। এছাড়া, প্রথম দিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পিডব্লিউডি বা সেনাবাহিনীকে বাস্তবায়নকারী সংস্থা র্নিবাচন করা হলেও শেষে সেনাবাহিনীকে দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সবকিছু প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় করার প্রক্রিয়াও চলছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেকটা ‘মাথাব্যথা’র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে এই কারাগারে রেখেই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। আবার অসুস্থতাজনিত কারণে তাকে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার বা গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারেও পাঠানো যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অসুস্থতাজনিত কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দেখভাল করেন। কাশিমপুরে পাঠানো হলে চিকিৎসকদের পক্ষে নিয়মিত সেখানে গিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা তদারক করা কঠিন হয়ে যাবে। এছাড়া, নিরাপত্তা ও নিয়মিত রোগীর চাপ থাকায় খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও স্থানান্তর করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন কারা অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা।
সংশ্লিস্ট ওই কারা কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি দ্রুত সুরাহার জন্য আলোচনা চলছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। তবে খালেদা জিয়াকে কাশিমপুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া মধ্যে রেখে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হতে পারে বলে জানান তিনি।








