জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ ও নবম-দশম শ্রেণির গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বিষয়ে কিশোরীর উপযুক্ত পোশাক, আচরণ, নিরাপত্তা রক্ষায় করণীয় এবং বিভিন্ন শারীরিক গড়নের মেয়েদের যেভাবে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত ‘আপত্তিজনক’ ও ‘দৃষ্টিকটু’ বলে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
তবে বই লেখার সঙ্গে জড়িতদের কেউ কেউ বলছেন, মেয়েদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তুলতে এসব বিষয়ে আলাপ থাকা জরুরি। তারা বলছেন, ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকলে তা বদলে ফেলা যেতে পারে। এদিকে এনসিটিবি বলছে, এসব ভাষা নিয়ে কোনও আপত্তি এলে তবেই এই বছর কালিকুলাম পরিমার্জনের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে এই বিষয়গুলোকে ‘বর্ণবাদমূলক’ মনে করেন কিনা এ প্রশ্নে বিষয়টি সরাসরি এড়িয়ে যান এনসিটিবি চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা।
বইয়ের লেখকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার ব্যবহার এবং রিপ্রেজেন্টেশন বদলায়। ফলে কোনও শব্দ অসংবেদনশীল মনে হলে সেটি বদলে ফেলা উচিত। যদিও নারীর পোশাক পরিধেয় ও শরীর নিয়ে বইয়ে যেসব ‘অসংবেদনশীল’ শব্দ আছে বলে আলোচনা উঠেছে সেগুলোকে তারা অসংবেদনশীল বলতে রাজি নন। তাদের বিশ্লেষণ, একজন কিশোরীকে পোশাকের ধরন, রঙ এবং সব মিলিয়ে নিজেকে উপস্থাপনে দক্ষ করে তুলতে এই অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে পোশাকের শিল্প উপাদান ও শিল্পনীতি অধ্যায়ে শ্যামলা বর্ণের মেয়েদের গায়ের রঙ উজ্জ্বল করার উপায় যেমন বলা আছে তেমনই বলা আছে রঙ ফর্সা হলে সেই মেয়েকে যেকোনও রঙের পোশাকেই সুন্দর দেখাবে। মোটা মেয়েরা কোন পোশাক পরবে বলে দেওয়ার পাশাপাশি গায়ের রঙ শ্যামলা হলে কোন রঙ নির্বাচন করতে হবে সেসবের রগরগে বর্ণনা রয়েছে।
নারী নেত্রীরা বলছেন, এটি একই সঙ্গে বর্ণবাদ ও অসংবেদনশীল ভাষা। অতিসত্বর এর পরিবর্তন জরুরি। লেখকরা বলছেন, ‘জেনারালাইজ করার সুযোগ নেই। এসব একজন কিশোরীকে দক্ষ করে তোলার প্রয়াস আকারেও দেখা যেতে পারে। তবে যদি কেউ এটিকে অসংবেদনশীল মনে করেন তাহলে চাইলেই এটি পরিবর্তন করতে পারে এনসিটিবি। আর এনসিটিবি বলছে, চাইলেই পরিবর্তন করা যায় না। কারিকুলাম পরিমার্জনের সময় শব্দগুলো পরিমার্জনে অবজারভেশন থাকলে পরিমার্জন করা হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের ‘পোশাকের শিল্প উপাদান ও শিল্পনীতি’ অধ্যায়ে পেছনের দিকে ঘাড়ের কাছে মাংস উঁচু থাকলে ব্লাউজের গলার ছাঁট কেমন হওয়া উচিত, বেশি স্ফীত বুক ও প্রশস্ত কোমরের অধিকারীরা কী ধরনের পোশাক পরবে সেই বিবরণ কী মনে করে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রশ্নের জবাবে বইটির একাংশের লেখক সৈয়দা সালিহা সালিহীন সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন খাটো ব্যক্তি চওড়া পাড়ের শাড়ি পরলে তাকে আরও খাটো দেখায়। এর মানে এই নয় যে, সে পরতেই পারবে না। অবশ্যই পারবে। কাপড় কীভাবে পরতে হবে তাতে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার রেওয়াজ আছে। গায়ের রঙ ময়লা হলে যদি হালকা রঙের পোশাক পরে তখন তার রঙটা প্রমিনেন্ট হয়ে যাবে, যদি গাঢ় পরে তাহলে তাকে অনেকটা উজ্জ্বল দেখাবে, এসব শেখার আছে। একজনকে দক্ষ করতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে উপযোগী করা হয়। গার্হস্থ্য বইয়ের এই অংশটি আমি না লিখলেও যারা লিখেছেন তারা অন্য কোনও উদ্দেশ্য থেকে এমন লিখেছেন বলে আমার মনে হয় না।’
মোটা খাটো ফর্সা শ্যামলা মেয়ের বিভাজন কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্নের জবাবে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যক্ষ ইসমাত রুমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বইটি ২০১৩ সালে লেখা হয়েছে। এরপর সম্পাদনা হয়। এরপর এনসিটিবি’র ফরম্যাট অনুযায়ী হয় এবং প্রতিবছর সংশোধন হয়। কনসেপ্ট পাল্টায়।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আগে প্রতিবন্ধী বলতাম, এখন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বলি। ফলে এগুলোও পরিবর্তন করতে পারে। আর এগুলো সব ইংরেজি বই থেকে বাংলা করা, ফলে মোটার জায়গায় হয়তো সুন্দরভাবে লেখা যায়। মোটাদের লম্বা স্ট্রাইপ, শুকনাদের আড়াআড়ি পড়তে হবে তাহলে ভালো লাগবে। বর্ণ যখন পড়াই তখন কোন রঙটা আমাদের ভালো লাগবে এগুলো শিখেছি। এখন যদি এগুলো নিয়ে সমস্যা হয় তাহলে পরিবর্তন হতেই পারে।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি কী মনে করেন প্রশ্নে বলেন, ‘কোন রঙ আমাকে ভালো লাগবে এটা শেখাতে গেলে এসব তো আসবে। তবে শব্দটা খারাপ লাগলে অবশ্যই ভালো কোনও শব্দ দেবো।’ সংশোধন যা হয় তা লেখকদের কাছে আসে না উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, ‘বিষয়ভিত্তিক কেউ থাকেন না এনসিটিবিতে। এইচএসসিতে আমরা বদলে দিয়েছি কিন্তু স্কুল পর্যায়ে এটা আমরা পারি না, এনসিটিবি’র মাধ্যমে হবে।’
২০১৩ সালের পর এই বইয়ের কোনও পরিমার্জন হয়নি উল্লেখ করে এনসিটিবি চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৯ সালে রিভিউ হবে, তারপর রিভিশন হবে, তারপর সিদ্ধান্ত হবে।’ সংশোধন পেতে আরও অনেক অপেক্ষা করতে হবে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই কাজটিতে সময় লাগবে, বই বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক যাচাই-বাছাই হয়ে আসে।’
যাচাই-বাছাইয়ের পরও কীভাবে অসংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। কারণ, এটা কোনও ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা না, এতে একটি গোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়।’
বইটির অধ্যায়গুলোতে দেহের আকৃতি ও রঙ উল্লেখ করে পোশাক নির্বাচনের কথা বলাটা ব্যক্তিগতভাবে তিনি বর্ণবাদমূলক মনে করেন কিনা প্রশ্নে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবো না। বই যারা লিখেছেন তারা অনেক পরিশীলিত হয়ে লিখেছেন। যদি কোনও অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) থাকে তখন সেটা দেখা যাবে।’
আরও পড়ুন: নিষেধাজ্ঞায় ভরা গার্হস্থ্য বই, দায় নিচ্ছেন না লেখক-সম্পাদক
পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি ‘অবমাননাকর’ কনটেন্ট, আসকের প্রতিবাদ








