খাদ্য নিরাপদ হবে তো?

সাদ্দিফ অভি
০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৪আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:১২





খাদ্য নিরাপদ হবে তো? ডায়েরিয়া থেকে শুরু করে ক্যানসার— এমন দুই শতাধিক রোগের জন্য দায়ী অনিরাপদ খাদ্য। বিভিন্ন সময়ে দেশে উৎপাদিত এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা খাদ্যে পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। এর পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড রংয়ের ব্যবহার তো আছেই। নানা সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা এ কথা স্বীকার করে বলছেন, কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। খাদ্যে রঙের ব্যবহারও অনেক কমেছে।


এ পটভূমিতে আজ শনিবার (২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবসে প্রশ্ন উঠেছে: বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপদ করা সম্ভব হবে তো?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) বলছে, উৎপাদন, বিতরণ এবং প্রস্তুতির সময় খাদ্য দূষিত হতে পারে। উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। ভেজাল খাবারের মাধ্যমে ২০০-এর বেশি রোগ শরীরে ছড়াতে পারে। প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতি বছর মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু।
ডাব্লিউএইচও বলছে, খাদ্যজনিত রোগের মধ্যে রয়েছে পাকস্থলীতে ব্যথা, বমি এবং ডায়রিয়া। খাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় মেটালের উপস্থিতি কিংবা প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হওয়ার টক্সিন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন ক্যানসার এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো রোগের সৃষ্টি করতে পারে। ভেজাল খাবারের কারণে সৃষ্ট ইনফেকশন নিম্ন আয়ের মানুষ এবং বয়স্কদের ওপর প্রভাব ফেলে বেশি। এছাড়া শিশু, গর্ভবতী নারীরাও খাবারজনিত সৃষ্ট রোগে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারিতে শুধু ঢাকা শহরেই ভেজালবিরোধী অভিযানে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরির অপরাধে ৭ দিনে ৩৫ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত। আদায় করা হয়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি জরিমানা। এর বাইরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ সিল করে দেওয়াসহ আদায় করেন ৩৫ লাখ টাকার বেশি জরিমানা।
গত সোমবার (২৮ জানুয়ারি) র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ফুড কোর্টে অভিযান চালিয়ে ৫টি রেস্তোরাঁকে সিলগালা করেন। এছাড়া ১৪টি রেস্টুরেন্টকে ৩২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং খাবারে কাপড়ের রঙ মেশানোর দায়ে এসব রেস্টুরেন্টকে সিলগালা ও জরিমানা করা হয়।
খাদ্য নিরাপদ হবে তো? জানা গেছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে প্রাথমিক প্রকল্প হিসেবে সচিবালয়ের আশেপাশের এলাকার রেস্তোরাঁগুলোকে মান নির্ধারণ স্টিকার দিয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। প্রথম পর্যায়ে ৫৭টি হোটেল-রেস্তোরাঁর মধ্যে ১৮টিকে ‘এ+’ এবং ৩৯টিকে ‘এ’ গ্রেডের স্টিকার দেওয়া হয়েছে। হোটেলগুলোর মানের উন্নতি-অবনতির সঙ্গে এই গ্রেড বাড়বে-কমবে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রেস্তোরাঁর প্রবেশপথেই বাধ্যতামূলকভাবে লাগাতে হবে স্টিকার। এতে ক্রেতারা শুরুতেই স্টিকার দেখেই বুঝতে পারবেন ভেতরের পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন, কিচেনের অভ্যন্তরে কী ধরনের দূষণ বা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার রয়েছে। এই গ্রেডেশন পদ্ধতির অন্যতম শর্ত হলো রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে হবে এবং ক্রেতারা তা মনিটরে দেখতে পাবেন।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ভেজালবিরোধী অভিযানে কতটুকু সাফল্য পেয়েছে জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বসুন্ধরা সিটিতে যে কয়টি দোকান আমরা বন্ধ করেছি তাদের মধ্যে খাবারে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রঙের ব্যবহার দেখতে পেয়েছি। সেই রঙ ব্যবহার করতো তারা চিকেন ফ্রাইতে। দ্বিতীয়ত, ব্যবহার করা হতো মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য। দেখা গেছে, ফাঙ্গাস পড়া রুটি দিয়ে স্যান্ডউইচ বানাচ্ছে। আরেকটা কমন সমস্যা হলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বসুন্ধরার ৮ তলা হচ্ছে লক্ষাধিক তেলাপোকার বাসস্থান।’
তিনি বলেন, ‘এমন একটা ধারণা ছিল যে বসুন্ধরা সিটিতে কেউ অভিযান করতে পারে না। কয়েকবার অভিযানে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু একটি-দুটি দোকানের বেশি অভিযান চালানো যায়নি। কারণ, বাকি দোকানগুলো বন্ধ করে দিতো দোকানিরা।’
খাদ্য নিরাপদ হবে তো? সারওয়ার আলম বলেন, ‘অন্যান্য হোটেলগুলোতে যখন অভিযান চালাই তখন কিন্তু দেখি তারা অনেকটা উন্নতির দিকে। কাঙ্ক্ষিত হয়নি, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রেস্তোরাঁগুলোর অনেক উন্নতি হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য আমাদের মনিটরিং অব্যাহত রাখতে হবে।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অর্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। উন্নত দেশেও খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের ঘটনা ঘটে। আমরা কাজ শুরু করেছি।’
তিনি বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কী জিনিস, এটাই আমরা একসময় জানতাম না। আমরা একসময় গুণগত মানকেই বুঝতাম। এখন আমরা কিছুটা সচেতন হয়েছি, ধীরে ধীরে আরও সচেতন হতে হবে।’
মাহফুজুল হক বলেন, ‘রেস্তোরাঁগুলোতে স্টিকারের প্রচলন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের, ভ্রাম্যমাণ মানুষের পথখাবারের ওপর যে নির্ভরশীলতা, সেখানে অনেক কিছু করতে হবে।’ এছাড়া কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে কাজ করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে কাজ করেন দেলোয়ার জাহান। তিনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করেন। বলেন, ‘উৎপাদন ক্ষেত্রে এবং পরে সংরক্ষণ ক্ষেত্রে খাদ্য দূষিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। নিরাপদ খাদ্য বাস্তবায়নে এই দুটি জায়গায় কাজ করা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘নতুন যে বিপদ আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে তা হলো— প্লাস্টিকের জন্য পরিবেশ দূষণ, নানা ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট বা ইলেকট্রনিক ওয়েস্টের কারণে নতুন একটি দূষণ দেখা দেবে। এটা মানুষের কোষে চলে যেতে পারে। এটা এখনও আমাদের সামনে উঠে আসেনি। ধীরে ধীরে আসলে সব দিকে দেখা দরকার।’

/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম