‘শুধু ইসির নয়, দায় রাজনীতিবিদ ও ভোটারদেরও’

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৫ মার্চ ২০১৯, ২২:২৯আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৯, ২২:৩৮

‘আলোচনায় সিটি নির্বাচন’ শীর্ষক বৈঠকিতে আলোচকরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ হারানোর পেছনে যেমন দায় রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি), তেমনি তা রয়েছে রাজনীতিবিদ ও ভোটারদেরও। ইসির পাশাপাশি মেয়র পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা, জনসম্পৃক্ত রাজনীতিবিদদের অনুপস্থিতি এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা না জানিয়ে ভোটারদের ভোট দানে বিরত থাকাও এবারের নির্বাচন প্রাণবন্ত না হওয়ার অন্যতম কারণ।     

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘আলোচনায় সিটি নির্বাচন’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন আলোচকরা। সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৫ মার্চ) বিকালে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

মুনিরা খান বৈঠকিতে ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের বিষয়টি তো এমন নয় যে, একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করতে পারলো না, চাকরি চলে গেল। তাকে তার পাঁচ বছরের কর্তব্য পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন করে যেতে হবে এবং নির্বাচনের মানকে উন্নত থেকে উন্নতর করতে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব যদি একটি নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করে বলে, “ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনকে (ইভিএম) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আইন করে।” তারা কিন্তু স্পষ্ট করেনি, কেন ইভিএমে ত্রুটি ছিল? আমি মনে করি, সংসদ সদস্যদেরও তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত ছিল। যেখানে ইসি নিজেই বললো ইভিএমে ত্রুটি ছিল, সেখানে তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই নির্বাচন সম্পর্কেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছেন, ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন হয়নি। একটা নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য যাকে আমরা দায়িত্ব দিয়েছি, তিনি যদি নিজেই নিজের সম্পর্কে নিশ্চিত না হন, তাহলে আমরা নির্বাচনকে কীভাবে সুষ্ঠু করবো?’

মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করলে ভোটারদের আসতে হয়তো একটু অসুবিধা হয়। কড়াকড়ি হালকা করলে ভালো। আগে নির্বাচন হতো চৌকিদার দিয়ে। সেটাও কিন্তু সুন্দর নির্বাচন হতো। ঢাকা শহরে বিভিন্ন প্রয়োজনে স্থানান্তরের কারণে ভোটার অনেক সময় দূরে চলে যায় তার কেন্দ্র থেকে। আসলে রাজনীতিবিদদের সবারই আগ্রহ থাকতে হবে। তাদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। তারা যখন প্রতিযোগিতায় নেমে যাবে, তখন ভোটাররা স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করবে। উৎসবটা তখনই তৈরি হবে।’   

সুকান্ত গুপ্ত অলক বেসরকারি চ্যানেল দেশ টিভির বার্তা বিভাগের সম্পাদক সুকান্ত গুপ্ত অলক বলেন, ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব যদি নির্বাচন কমিশনের হয় তাহলে তাদের দায় আছে। অথচ প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলছেন, “এখানে রাজনৈতিক দলের দায়, প্রার্থীদের দায়”, এখানে একজন বলেছেন, ভোটারদেরও দায়। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছিলাম, এক বছরের জন্য হলেও এই নির্বাচন করতে হবে। কারণ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। একইভাবে ভোট দেওয়াও আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভোটারদের কেন্দ্রে না যাওয়ার মূল কারণগুলো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (নির্বাচন কমিশন) আমলে নিচ্ছে না। নির্বাচন অবশ্যই রাজনীতির বিষয়, রাজনৈতিক দলের বিষয়। কিন্তু সেই রাজনীতিটি আছে কিনা? এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার প্রার্থী দিয়েছে। সেই প্রার্থী কি রাজনৈতিক প্রার্থী? জাতীয় পার্টি একজন প্রার্থী দিয়েছে। তিনিও কি রাজনৈতিক? না। যে কারণে দেখবেন তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কিন্তু দেখা যায়নি। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন জন্মগত রাজনীতিবিদ। একটু গভীরে গিয়ে এ বিষয়গুলো চিন্তা করা দরকার।’

দিলীপ কুমার সরকার সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের যে নির্দেশকগুলো থাকে, তার মধ্যে একটা হলো, অনেক বিকল্পের মধ্য থেকে প্রতিনিধি বাছাই করা। ওই সুযোগটি তো নেই। ফলে আমরা মনে করছি, এখানে কাজ করা অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মহাজোট ছাড়াও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। আবার সিটি নির্বাচন যখন আসলো, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বললো, “যাবো না”, বাম গণতান্ত্রিক জোট বললো, “যাবো না।” আর যারা যাচ্ছে তারা সেইভাবে দৃশ্যমান না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই নির্বাচন পরিচালনা করার মূল দায়িত্ব যেহেতু নির্বাচন কমিশনের ছিল, তাই এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায় তাদেরই। উল্টো সিইসি বলেছেন, “এটা রাজনৈতিক দলের দায়।” নির্বাচন কমিশনসহ সবাইকে আইনের ওপর দাঁড়িয়ে সাহসিকতার সঙ্গে, নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ বিষয়ে কোনও ধরনের দুর্বলতা দেখানো চলবে না।’

শেরিফ আল সায়ার বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণা বিভাগ প্রধান শেরিফ আল সায়ার বলেন, ‘এটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়নি। এর একটি কারণ হলো, আমাদের একটি মাইন্ডসেট হয়ে গেছে– কোনও নির্বাচনে বিএনপি না এলে আমরা সেটাকে বলছি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নয়। ২০১৫ সালের নির্বাচনে প্রার্থী ছিল ১৬ জন, এখন নেমে এসে পাঁচজন হয়েছে। ১৬ জনের মধ্যে তাবিথ আউয়াল ভোটের দিনের অর্ধেক সময়ের মধ্যেই নির্বাচন বয়কট করেছেন। তার সঙ্গে জোনায়েদ সাকিও বয়কট করেছেন। তখন কিন্তু উৎসবে খুবএকটা ভাটা পড়েছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়নি। কিন্তু এই বছর এসে দেখা গেল, শুরু থেকেই প্রার্থীদের প্রচারণা হলো না। সেখানেই একটা বড় ঘাটতি। এটা শুধু নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব না, মাঠ গরম করবেন রাজনীতিবিদরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমরা দেখেছি, শহরে যারা মেয়র পদে দাঁড়ান তারা “পলিটিক্যাল সেলিব্রিট্রিতে” পরিণত হন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আমরা সেই জায়গায় যেতে পারিনি। এখন এইসব দায়ভার সবাইকেই নিতে হবে বলে আমি মনে করি।’    

মুন্নী সাহা ছবি: নাসিরুল ইসলাম

 

/এসও/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম