বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনের দুই দিনের মাথায় ভবনের দুই মালিককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেড় মাস পার হয়ে গেলেও পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার সেই ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতালার কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকদের গ্রেফতার করা হয়নি। এমনকি গ্রেফতার করা হয়নি ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক দুই ভাইকেও, এ ব্যাপারে পুলিশি তৎপরতা শুরুর আগেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটির তদন্ত চলছে। চুড়িহাট্টার কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
আলোচিত এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুরাদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনের কেমিক্যাল গোডাউন মালিককে শনাক্ত করেছি। তবে তদন্তের স্বার্থে তার নাম-পরিচয় কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি। কিন্তু এখনও গ্রেফতার করতে পারিনি।’
উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৩২ মিনিটে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের ওয়াহেদ ম্যানশনসহ আশেপাশের পাঁচটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে দগ্ধ হয়ে নারী ও শিশুসহ মোট ৭১ জন নিহত হন। দগ্ধ ও আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪১ জন। এ ঘটনায় নিহত জুম্মন নামে এক ব্যক্তির ছেলে আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আসামির তালিকায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছেন।
চকবাজারে ভয়াবহ এই ঘটনার পর আগুনের সূত্রপাত ও অন্যান্য কারণ অনুসন্ধান করতে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পক্ষ থেকে পাঁচটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সব তদন্ত প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর স্থানীয় অনেকেই সে সময় জানিয়েছিলেন—তারা ঘটনার আগে প্রতিদিনই চুড়িহাট্টায় সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেতেন। দোতলার গোডাউনে সুগন্ধী ক্যানে গ্যাস রিফিল করা হতো। কসমেটিকস ও সুগন্ধী আমদানি করা এক ব্যবসায়ী জানান, পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি সুগন্ধী আমদানি করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল সুগন্ধী ক্যান তৈরি করত। এসব ক্যানেই নতুন করে রিফিল করার কারণে তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং গোডাউনে ‘গ্যাস চেম্বার’ তৈরি হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী যে গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তারাই দায়ী হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু দেড় মাসেও কার্যকরী কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বনানীর অগ্নিকাণ্ডের পরদিন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারীর কাছে চুড়িহাট্টার মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জামিন পাওয়ার অধিকার সবারই রয়েছে। তারা জামিন নিয়েছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তে তাদের দোষ প্রমাণিত হলে সেভাবেই আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’ আইজিপি আরও বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। আমরা তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’
বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকদের পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়। ‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করত। এই প্রতিষ্ঠানটি অন্তত তিন দশক ধরে সুগন্ধী ও কসমেটিকস জাতীয় পণ্য আমদানি ও সরবরাহ করে আসছিল। পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের অফিস ছিল হাতিরপুলের ১৩/১ নম্বর সোনারগাঁও রোডে কাশেম সেন্টারের ছয় তলায়। আগুনের ঘটনার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় বন্ধ ছিল। সম্প্রতি ওই কার্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানের সব জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ওই ভবনের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে পার্ল ইন্টারন্যাশনালের অন্যতম নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কাশিফ এবং দুই পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ, মোজাম্মেল ইকবালের মোবাইল নম্বরও বন্ধ রয়েছে। ঘটনার পর থেকে তারা সবাই লাপাত্তা। যদিও ঢাকার ধানমন্ডি, বসুন্ধরা সিটি, বেইলি রোড, গুলশান-বনানী এলাকায় পার্ল ইন্টারন্যাশনালের সহযোগী একাধিক প্রতিষ্ঠান এখনও চালু আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর দাবি, আশির দশক থেকে আমদানিকারক হিসেবে পরিচিত পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিকরা অবাঙালি। চকবাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের ‘মারোয়ারি ব্যবসায়ী’ বলে জানেন। শত কোটি টাকার মালিক এই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) চুড়িহাট্টার আগুনের ঘটনা নিয়ে এক গণশুনানিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, চুড়িহাট্টার ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আশ্বাস মিললেও এ পর্যন্ত কোনও শাস্তি দৃশ্যমান হয়নি। রবিবার (৩১ মার্চ) যোগাযোগ করা হলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ওইখানে (চুড়িহাট্টা) ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটা চাপ আছে। আর এখানে (বনানী) ব্যবসায়ী দুজন, যাদের ধরা হয়েছে তাদের বিশেষ একটা রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। ওইখানে (চুড়িহাট্টা) ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের চাপের কারণে তাদের (মামলার আসামি) ধরা হচ্ছে না। আর এখানে (বনানী) দেখছি এই দুজনই বিরোধী শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, সেজন্য তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। রূপায়ণের মালিককে কিন্তু ধরা হয়নি। তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।’ এসব ঘটনায় অবশ্যই আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।








