রাজধানীতে অসংখ্য বহুতল ভবন রয়েছে যেগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম যুক্ত করার পরও ঝুঁকিমুক্ত হবে না। কারণ, ভবনের নকশাজনিত ত্রুটির কারণে এগুলো সবসময় ঝুঁকিতেই থাকবে। অগ্নিকাণ্ডের সময় এসব ভবন থেকে মানুষ দ্রুত বের হতে পারবে না বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের কর্মকর্তারা। ১ এপ্রিল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা যেসব ভবন পরিদর্শন করেছেন তার বেশিরভাগেরই অগ্নিঝুঁকির কথা জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ২০১৬ সালে করা জরিপ অনুযায়ী, রাজউক আওতাধীন এলাকায় ২২ লাখের বেশি ইমারত রয়েছে। এরমধ্যে ৮৪ শতাংশ ভবন একতলা। আর তিন হাজার ২৭৩টি বহুতল ভবন রয়েছে। এসব বহুতল ভবনের অধিকাংশও আগুনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই তথ্য ২০১৬ সালের। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ৮ হাজার ৭৩০টি ভবনের প্ল্যান পাস হয়েছে। ফলে বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়েছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) নিয়াজ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছি না। আমরা বলছি ফায়ার সার্ভিসের শর্ত অনুযায়ী ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। যদি ভবন কর্তৃপক্ষ আমাদের শর্ত অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তবে আমরা সন্তোষজনক বলবো। এখন যেসব ভবনে ইমার্জেন্সি এক্সিট সিঁড়ি নেই সেখানে যদি তারা সেটি স্থাপন করে এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম স্থাপন করে তবে আমরা সেটিকে নিরাপদ বলবো। তবে ইমার্জেন্সি এক্সিট যদি না থাকে, ছাদ যদি খোলা না থাকে, রিজার্ভ ট্যাংক যদি ভবন অনুযায়ী বড় না থাকে, সিঁড়ি প্রশস্ত না থাকে, পাইপে পানির চাপ যদি পরিমাণ মতো না থাকে তাহলে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও আমরা ওই ভবনকে ঝুঁকিমুক্ত বলবো না। কারণ, এসব ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তাতে হতাহতের আশঙ্কা থাকবেই। মানুষ বের হতে পারবে না।’
বুধবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের লোকমান হুসাইন টাওয়ার পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের একটি টিম। ১২ তলা এই ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার কী ব্যবস্থা রয়েছে তা দেখতেই বেজমেন্ট থেকে ছাদ পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোর পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের টিম। ফায়ার সার্ভিসের শর্ত অনুযায়ী, এই ভবনটিতে বেশ কিছু অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ভবনে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের (এক্সটিংগুইশার) কিছু স্বল্পতা রয়েছে। ভবনে পানির পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকলেও কিছু কিছু ফ্লোরে ওয়াটার স্টোরস, হাইড্রেন্ট সিন্টেম নেই। ভবনে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি থাকতে দেখা গেলেও তা সব ফ্লোরে ছিল না। ভবনের ছাদ সম্পূর্ণ খোলা ছিল না। এজন্য ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শন টিম ভবন কর্তৃপক্ষকে অগ্নিনিরাপত্তার এসব ত্রুটি উল্লেখ করে সেগুলো দ্রুত সংস্থাপন ও বাস্তবায়ন করতে কিছু সুপারিশও দেয়।
কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের লোকমান হুসাইন ভবনটি পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) নিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এফ আর টাওয়ারের তুলনায় এই ভবনটি অনেকটা উন্নত। এই ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা রয়েছে, তবে কিছু ত্রুটিও রয়েছে। সেই ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে আমরা ভবন কর্তৃপক্ষকে কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য বলেছি।’
কী কী ত্রুটি পাওয়া গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের যেসব শর্ত রয়েছে সে অনুযায়ী এই ভবনের কিছু কিছু ফ্লোরে ওয়াটার স্টোরেজ ছিল না। কয়েকটি জায়গায় ইমার্জেন্সি এক্সিট দেখা যায়নি, কিছু ফ্লোরে হাইড্রেন্ট সিন্টেম ছিল না। এছাড়া অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের কিছু স্বল্পতা রয়েছে। এই ভবন পরিদর্শন করে আমরা বড় ধরনের কোনও ত্রুটি পাইনি। তবে আরও কিছু ত্রুটি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধান করতে কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ভবনগুলোর পরিদর্শন হঠাৎ করা হচ্ছে না, এটা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। এর আগেও রাজধানীর প্রতিটি ভবন পরিদর্শন করা হয়েছে। তখনও এসব ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কী কী ঘাটতি ছিল সেগুলোর সুপারিশ ভবন মালিকদের দেওয়া হয়েছিল। বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে যেসব বহুতল ভবন রয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবক’টিই পরিদর্শন করা হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে যেসব ভবন খুবই অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে সেগুলোকে চিহ্নিত করে সতর্কতার জন্য ব্যানার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু বনানী এলাকায় নয়, পুরো ঢাকা শহরে আমাদের অভিযান চলছে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, বনানীর ১৭ নম্বর রোডের বসতি হরিজন বাণিজ্যিক ভবন ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা নেই। এরমধ্যে ফায়ার হোজরিল নেই, পর্যাপ্ত এক্সটিংগুইশার নেই, ইমার্জেন্সি এক্সিট-ওয়ে বা সিঁড়ি নেই। এই ভবনে ওঠানামার জন্য মাত্র একটি সরু সিঁড়ি এবং দুটি লিফট রয়েছে। এরমধ্যে একটি লিফট দুই সিঁড়ির মাঝামাঝি অংশে অবস্থিত, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের নকশায় এই লিফটের বিষয়টি উল্লেখ নেই। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রিক সব স্টেশন এবং সেখানেই রয়েছে গাড়ির গ্যারেজ। তবে গাড়ি ওঠানামার জন্য র্যাম্প নেই। আছে মাত্র একটি কার লিফট, সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ।
ফায়ার সার্ভিসের শর্ত অনুযায়ী, ভবনের ফ্লোরগুলোতে হোজরিল পাইপ ও হোজরিল পাইপ বক্স রাখা হয়নি। যদিও নামমাত্র একটি হোজরিল বক্স দেখা গেছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই। ভবনে কোনও হাইড্রেন্ট সিস্টেম নেই। ভবনের বেজমেন্টে বহির্গমনের জন্য দুটি ফটক রয়েছে। তবে ভবনের বাইরে ইমার্জেন্সি এক্সিট সিঁড়ির কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনের ফ্লোরগুলোতে যেসব ফায়ার হোজরিল পাইপ বক্স লাগানো হয়েছে সেগুলো খুবই ছোট এবং অকার্যকর। কোনও দুর্ঘটনার সময় সেগুলো চোখে না পড়ার মতো জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে।
বনানীর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এফ আর টাওয়ারের সঙ্গে লাগোয়া ভবন আহমেদ টাওয়ারে চলছে ফায়ার হোজরিল বক্স স্থাপনের কাজ। ভবন নির্মাণের সময় সেটি ছিল না। তাই আগুনের ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ সেগুলো ভবনের সিঁড়ির পাশে স্থাপনের কাজ করছে। এই হোজরিল বক্স প্রতিটি ফ্লোরেই স্থাপন করা হচ্ছে। এই ভবনের ফ্লোরগুলোতে আগে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল না।
এ বিষয়ে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আমির হাওলাদার বলেন, ভবনের প্রতিটি ফ্লোরেই ফায়ার হোজরিল বক্স তৈরি করে সেটি লাগানোর কাজ চলছে। ফায়ার এক্সটিংগুইশারগুলো রাখার জন্য একটি করে হুক তৈরির কাজ করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অগ্নিঝুঁকি এড়াতে এবং ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ভবন নির্মাণের সময়ই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নকশায় থাকতে হবে। এগুলো কাটছাঁট করে ভবন তৈরি করলে কখনও শতভাগ অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।’
ভবনের ইমার্জেন্সি সিঁড়ি, ভবন অনুযায়ী পানির রিজার্ভ হাউজ, ভবনের ছাদে খালি জায়গা, প্রশস্ত সিঁড়ি রাখার পর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখলে ভবনে অগ্নিঝুঁকি কম থাকে। তবে শুধু সরঞ্জাম বা শুধু ইমার্জেন্সি সিঁড়ি দিয়ে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। যেসব বহুতল ভবন ইমার্জেন্সি সিঁড়ি ছাড়া তৈরি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের সিদ্ধান্ত কী জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখনও ভবন মালিকদের অনুরোধ করছি ইমার্জেন্সি সিঁড়ি নির্মাণের জন্য। এখনও সুযোগ রয়েছে সিঁড়ি নির্মাণ করার। এছাড়া ঝুঁকি থেকেই যাবে।’ তবে রাজধানীতে এরকম কত ভবন রয়েছে তা জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।








