দুই বছর আগে কদমতলীর বাসিন্দা হেলাল উদ্দিনকে (২৬) মাথায়, বুকে, পেটে চাকু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। স্থানীয় একটি রিকসার গ্যারেজে মধ্যরাতে এই খুনের ঘটনা ঘটে। রিকসাচালক ও স্থানীয় বাসিন্দা মোট আটজনে হত্যা করে হেলালকে। এই হত্যার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। স্থানীয় একটি বাড়ির মালিকের প্রশ্রয়ে চাঁদাবাজি ও টার্গেট ব্যক্তিদের ওপরে অত্যাচার করে আসছিল হেলাল। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়েই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় তাকে।
২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর রাত দেড়টার দিকে খুন হয় হেলাল। তাকে হত্যার পরপরই আসামিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ চলে যায় ঢাকার বাইরে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বেলালউদ্দিন বাদী হয়ে কদমতলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত করে কোনও কুলকিনারা না পেয়ে ঘটনার ছয়মাস পর মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডেমরা জোনাল টিমের কাছে হস্তান্তর করে।
ক্লুলেস এ মামলার রহস্য উদঘাটন হয়েছে দুই বছর পর।হত্যায় অংশ নেওয়া আটজনের মধ্যে দুজনকে গত ২০ মার্চ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তারা হলো— মো. সাদ্দাম ও শফিকুল ইসলাম রতন। গত ২১ মার্চ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম গ্রেফতার হওয়া দুজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
আদালতে আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে হেলালকে হত্যার কারণ সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নাজমুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেলালকে হত্যার পর জড়িতরা সবাই পালিয়ে যায়। ক্লুলেস মামলা হিসেবে এ হত্যার তদন্ত শুরু করি। ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর সন্দেহভাজনদের খোঁজ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। একপর্যায়ে রহস্য উদঘাটন হয়। দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডি. এম. এ. মজিদ বলেন, ‘ গ্রেফতার সাদ্দাম ও শফিকুল হেলাল হত্যার সঙ্গে জড়িত। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
হেলালকে হত্যার কারণ সম্পর্কে এর মামলার তদন্তে থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, ডেমরার শেষ সীমানায় স্থানীয় এক জমিদারের (বাড়ির মালিক) ছত্রছায়ায় থেকে মাদক ব্যবসা, সেবন ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরে অত্যাচার করে আসছিল হেলাল। ঘটনার কয়েকদিন আগে এলাকায় বসবাসকারী একজনের কাছে চাঁদা আনতে যায় সে। চাঁদা আনতে গিয়ে বাড়ির কর্তাকে না পেয়ে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও মাকে মারধর করে হেলাল। এতে ওই অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভে থাকা বাচ্চাটি মারা যায়।
হেলালের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সে অনুযায়ী ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর রাতে হেলালকে হত্যা করা হয় বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে হত্যায় অংশ নেওয়া সাদ্দাম ও রতন।
জবানবন্দিতে সাদ্দাম বলে, ‘আমি দীর্ঘ তিন বছর ধরে আলেফ চান্দের গ্যারেজে থেকে রিকশা চালাই। হেলাল উদ্দিন স্থানীয় রিকশাচালক ও ফুটপাতের দোকানিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নিতো। চাঁদার টাকা না পেলে সে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো। তার চাঁদাবাজি ও নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে আমরা তাকে হত্যা করেছি। তাকে হত্যার কারণে যদি ফাঁসি হয়, তাতেও সমস্যা নেই।’
হেলালকে হত্যার আগে সাদ্দাম ও হেলাল দুজনে ভাগাভাগি করে ভাত খায়। রাতের খাবার শেষে গ্যারেজে বসে ইয়াবা সেবন করে হেলাল। এরপর বাইরে থেকে আসে আরও কয়েকজন। পরে আটজনে মিলে হেলালকে হত্যা করে।
হত্যার বর্ণনা দিয়ে সাদ্দাম জবানবন্দিতে বলে, ‘২৮ অক্টোবর রাত দেড়টার দিকে শাকিল খাবার নিয়ে এসে বলে, এটা হেলালের ভাত। আধা ঘণ্টা পর হেলাল ভাই গ্যারেজে আসে। আমি ও হেলাল ভাই দুজনে মিলে ভাগাভাগি করে তার ভাত খাই। ভাত খাওয়া শেষে হেলাল ভাই গ্যারেজের মাচাংয়ের ওপরে বসে ইয়াবা খায়। এরইমধ্যে গেটে স্বপন আসে এবং গ্যারেজের গেট খুলতে বলে। আমি গ্যারেজের গেট খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রানা, সোহেল, রতন, স্বপন, পিচ্ছি কাউসার ও সজিব গ্যারেজের ভেতরে ঢুকে। রতনের হাতে চাপাতি, সোহেলের হাতে সুইচ গিয়ার, স্বপনের হাতে লোহার চাকু, রানার হাতে স্টিলের চাকু ছিল। আমিসহ সবাই হেলাল ভাইকে জাপটে ধরে কিল, ঘুঘি ও লাথি মেরে মাচাংয়ের ওপর থেকে নিচে মাটিতে ফেলে দেই। রানা ও সোহেল তাদের হাতে থাকা চাকু দিয়ে হেলালের চোখে ও অন্যান্য জায়গায় এলোপাতাড়ি পাড় (আঘাত) মারে। স্বপন বড় চাকু দিয়ে হেলালের নাভির ওপরে পোচ মারে। এতে হেলালের ভুড়ি বের হয়ে আসে। এমন সময় হেলাল ভাইয়ের চিৎকার শুনে দারোয়ান লতিফ ভাই গ্যারেজের ভেতরে আসতে চাইলে রতন ভাই তাকে চাপাতির ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এরপর হেলালের মৃত্যু নিশ্চিত করে আমি, স্বপন, রানা, সোহেল, রতন, পিচ্ছি কাউসার ও সজিব সবাই যে যার মতো দৌড়ে গ্যারেজ থেকে বের হয়ে পালিয়ে যাই।’








