কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও ৬৮ শতাংশ পোশাক কারাখানায় এমন কমিটি নেই বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সম্প্রতি পোশাক শিল্পের ৩ হাজার ১৪ জন নারী শ্রমিকের ওপর চালানো একটি গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে কর্মজীবী নারী।
সোমবার (২৯ এপ্রিল) বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এলাকার ৩২৭টি পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের নিয়ে এ গবেষণাটি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়- ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারিসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা (গাইডলাইন) জারি করেন। হাইকোর্টের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখতে কর্তৃপক্ষকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কিন্তু ২০১৯ সালে এসে দেখা গেছে মাত্র ৪ শতাংশ পোশাক কারখানায় হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি আছে এবং ২৮ শতাংশ নারী শ্রমিক জানেন না তাদের কারখানায় আদৌ এই কমিটি আছে কি না? আর ৬৮ শতাংশ পোশাক কারখানায় এই কমিটি নেই বলে জানা গেছে গবেষণায়।
গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে ড. জাকির হোসেন বলেন, নারী শ্রমিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানি কথা মুখ খুলে বলতে চায় না। তারা যে শুধু কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন তা নয়, কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। এর একটা মূল কারণ হাইকোর্টের দেওয়া গাইডলাইনে কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকার কথা বলা হলেও আমরা দেখি মাত্র ৪ শতাংশ পোশাক কারখানায় এই কমিটি আছে। ৬৮ শতাংশ পোশাক কারখানায় এই কমিটি নেই এবং ২৮ শতাংশ পোশাক শ্রমিক এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
নারী শ্রমিকদের না জানার কারণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, শুধু যে কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন তা নয়, মাতৃত্বকালীন সময়ে নারী শ্রমিকদের কাজ করার যে বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয় সেক্ষেত্রে কাজে যাওয়ার সময় এবং সেখান থেকে ফেরার সময় অনেক ঘটনাই ঘটে যেগুলো কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেক্ষেত্রে আমরা দেখি যে মাত্র ১৭ শতাংশ পোশাক কারখানা তাদেরকে রাত্রিকালীন ডিউটিতে পরিবহনের ব্যবস্থা করে দেন অথবা কাউকে দিয়ে এগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ শ্রমিক জানেন না যে মালিকের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনও ব্যবস্থা আছে কিনা।
কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও বৈষম্যের বিষয়ে গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতি চারজনে একজন নারী শ্রমিক (৭২ শতাংশ) মৌখিক হয়রানির শিকার হয়। তিনভাগের এক ভাগ নারী (৬২ শতাংশ) নারী শ্রমিকরা মানসিক নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খুলেন, প্রতি পাঁচজনে একজন নারী শ্রমিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং ১৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়।
কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং বিশ্রামের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় ৩৪ শতাংশ নারী শ্রমিকের জন্য রাত্রিকালীন ডিউটি বাধ্যতামূলক। ৪ শতাংশ শ্রমিক জানেন না রাত্রিকালীন ডিউটি বাধ্যতামূলক কিনা? এছাড়া ৫৫ শতাংশ নারী শ্রমিকের কাছ থেকে মালিকপক্ষ রাত্রিকালীন ডিউটির জন্য লিখিত অনুমতিপত্র নেয় না এবং ৩৫ শতাংশ নারী শ্রমিক জানেন না লিখিত অনুমতিপত্র দেওয়ার কথা।
কর্মঘণ্টার বিষয়ে আরও বলা হয়, তিনভাগের দুইভাগ নারী শ্রমিক প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা কাজ করে। ৩৪ শতাংশ নারী ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করে এবং ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী শ্রমিক দুপুরে খাবারের বিরতি ছাড়া আর কোনও বিরতি পায় না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ শিরীন আখতার বলেন, আমরা আমাদের অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থাকে বর্ণনা করতে চাই। কিন্তু এই বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও আমার শুরু যেই জীবন ছিল, আজকে ৩০ বছর পরে আমার জীবনটা কেমন এই দুটি জিনিসের নিশ্চয়ই কিছুটা পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য কিন্তু আমাদেরকে সব সময় তুলে ধরতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কাজের বিশ্বে কাজের মান কোথায়, যারা কাজ করছে সেই শ্রমিকের মর্যাদা কোথায় – এই দুটি জিনিসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের বিবেচনা করা দরকার। আজকের পোশাক শিল্পের অবস্থা কিন্তু বিভিন্নরকম। আজকে আপনারা ‘এ’ ক্যাটেগরির পোশাক কারখানাগুলো দেখেন, তাদের অবস্থা কী? সেখানে তাদের কাজের যে পরিস্থিতি সেটা আপনি কীভাবে মাপবেন? সেটা মনিটর করবেন কীভাবে, তার একটা অবস্থা তৈরি করতে হবে। ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরির যারা তাদের অবস্থা কী? তাদের অবস্থাও মাপতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সবজায়গায় আমার মৌলিক যে অধিকার, আমার ট্রেড ইউনিয়ন করার যে অধিকার, আমার বেঁচে থাকার অধিকার সুনিশ্চিত হচ্ছে কিনা, এই কাজগুলো যদি আমি না করতে পারি তাহলে যতই আমি কথা বলি পরিস্থিতি নিয়ে সেগুলো কিন্তু আমি পারবো না। তাই পরিপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ একটি ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার হবে আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য খুব প্রয়োজনীয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, কর্মজীবী নারীর সভাপতি ড প্রতিমা পাল মজুমদার, সহ সভাপতি উম্মে হাসান , কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপমহাপরিদর্শক মতিউর রহমান প্রমুখ।








