একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপিসহ বিভিন্ন অভিযোগে হাইকোর্টের নির্ধারিত আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৮০ পরাজিত প্রার্থী। আড়াই মাস অতিবাহিত হতে চললেও আপিল শুনানি নিয়ে অগ্রসর হননি আইনজীবীরা। মামলাগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আইনজীবীরা বলছেন, ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মামলাগুলোর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। এখন যেহেতু নির্বাচিত ৮ প্রার্থীদের শপথ বিষয়টি মীমাংসিত হয়েছে। ফলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে ডেকে বিএনপির সঙ্গে কথা বলে আপিলের শুনানি উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলো পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের শরিক বিএনপির প্রার্থীদের মামলা বেশি হওয়ার দলটির পক্ষ থেকে আলাদা একটি টিমও কাজ করবে।
নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে করা মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিটি মামলায় প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘঠিত দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা বর্ণনা, ঘটনার স্বীকার ব্যক্তিদের নামসহ তাদের পূর্ণ পরিচয় এবং ঘটনার সাক্ষীদের নাম ও তাদের পরিচয় বৃত্তান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
এসব মামলায় বিশেষ যে অভিযোগ তোলা হয়েছে,‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দ্বারা হামলার স্বীকার হয়ে অনেক প্রার্থী তাদের নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারেননি। নির্বাচনের দিন প্রার্থীরা বিভিন্ন কারণে প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনি কর্মকর্তাদের কাছে গেলেও কোনও সঠিক ও কার্যকরী প্রতিকার পাননি।’
মামলাগুলোয় আরও অভিযোগ করা হয়,‘আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তাদের কর্মী ও সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে বিএনপি প্রার্থীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ভোটারদের মনে ভোট দেওয়া নিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যার ফলে ভোট দিতে আসার বিষয়ে ভোটারগণ ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগের রাতেই সকল কেন্দ্রে জাল ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভরাট ও ৩০ ডিসেম্বর সকালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্র সজ্জে সজ্জিত হয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে ভীতি প্রদর্শন করেন। সব ভীতি অতিক্রম করেও ৩০ ডিসেম্বর ভোট দিতে এসে অনেকেই ব্যালট পেপার পাননি বা ব্যালট পেলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।’
‘নির্বাচনের দিন প্রার্থীদের এজেন্ট বের করে দেওয়ার সময় পুলিশ কিংবা নির্বাচনি কর্মকর্তাগণ কোনও কার্যকরী ভূমিকা পালন করেননি বলে অভিযোগ তোলাসহ আরও বেশ কিছু যুক্তি আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে মামলাগুলোতে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের ৮০ জন প্রার্থী নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। কিন্তু জোটের প্রার্থীদের শপথের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ার কারণে মামলাগুলো শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন এই বিষয়ে তো একটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। আগামীতে জোটের বৈঠকে মামলার কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতি যা হওয়ার তা তো হয়ে গেল। এখন সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগুতে চায়। ফলে বিএনপির সঙ্গে কথা বলে মামলা শুনানির শুরু করা হবে।
আপিল আবেদনকারীদের অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, প্রত্যেক আবেদনকারী নিজ নির্বাচনি আসনে বিপরীত প্রার্থীদের বিবাদী করেছেন। আবেদনে বিবাদী বিজয়ী প্রার্থীদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল চাওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রত্যেক সংসদীয় আসনের নির্বাচনও বাতিল চাওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সারাদেশের ৬৪ জেলা থেকে হাইকোর্টের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। যার ধারাবাহিকতায় গত ১২, ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সবগুলো মামলাগুলো দায়ের করা হয়। কিন্তু এরপর আর মামলাগুলো শুনানিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি।
তবে পরাজিত বিএনপি প্রার্থীদের হাইকোর্টের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে করা আপিল শুনানির বিষয়ে তাদের অন্যতম আইনজীবী এ কে এম এহসানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমরা আপিল দায়ের করেছি। তবে সে আপিলের আমরা দলীয় সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। আমরা কবে রিটগুলো শুনানির জন্য আদালতে উত্থাপন (মেনশন) করবো এবং রিটগুলোর শুনানি কীভাবে হবে, তাসহ সার্বিক দিক নিয়ে সিদ্ধান্ত পেলে তবেই আমরা মামলাগুলোর শুনানি শুরু করতে অগ্রসর হবো।’
বিএনপির হাইকমান্ড ইতোমধ্যে এসব মামলা দেখভালের জন্য আইনজীবীদের একটি টিম গঠন করেছে। ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস ছাড়া এই টিমে আছেন ব্যারিস্টার আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, মীর নাসির উদ্দিন, ফজলুর রহমান এবং ব্যারিস্টার রাজিব প্রধান।
ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যারা মামলা করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ঢাকা- ৬ আসনে অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ঢাকা-৭ আসনে মোস্তফা মহসীন মন্টু, ঝিনাইদহ-৪ আসনে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, টাঙ্গাইল-৭ আসনে আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, বরিশাল-১ আসনে জহির উদ্দিন স্বপন, গাজীপুর-৪ আসনে শাহ রিয়াজুল হান্নান, মৌলভীবাজার-৩ আসনে নাসের রহমান, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে আবদুল হাই, ভোলা-২ আসনে হাফিজ ইব্রাহিম, মানিকগঞ্জ-২ আসনে মঈনুল ইসলাম শান্ত, নরসিংদী-৫ আসনে আশরাফ উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নজরুল ইসলাম আজাদ, ঢাকা-৫ আসনে নবী উল্যাহ নবী, ঢাকা-২ আসনে ইরফান ইবনে আমান অমি, পাবনা-১ আসনে অধ্যাপক আবু সাইদ, কুড়িগ্রামের একটি আসনে আমসা আমিন।
নির্বাচনি ট্রাইব্যুালে মামলা করা গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ‘ভোট চুরির সব রকমের তথ্য-প্রমাণ দিয়ে মামলা করেছি। এতোদিন বিভিন্ন কারণে মামলাগুলো শুনানির উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। আশা করি খুব শীঘ্রই এর শুনানি শুরু হবে।’








