রমজানে অফিস বা কাজ শেষে অধিকাংশ মানুষ বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতে চান। ঘরমুখী মানুষের ফেরার পথে বড় বাধা যানজট। এই যানজট নিরসন করে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে যেন মানুষ বাড়ি ফিরতে পারেন সে ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। নানামুখী উদ্যোগের ফলে ইফতারের আগেই কর্মস্থল থেকে নগরীর বাসিন্দারা বাড়ি পৌঁছাতে পারছেন বলে দাবি করেছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
নগরীতে চলমান মেট্রোরেলের কাজ, ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি, বিশৃঙ্খল যান চলাচল, ভারী বৃষ্টি হলে সম্ভাব্য জলাবদ্ধতা- এগুলো যানজট নিরসনে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বাধাগুলো অতিক্রম করে ঘরমুখী মানুষের চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক, নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রমজান উপলক্ষ্যে নগরীতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। ক্রাইম পুলিশও আমাদের সঙ্গে ইন্টারসেকশনে কাজ করছে। মেট্রোরেলের কাজকে মাথায় রেখে আমরা একটু অতিরিক্ত সতর্ক আছি। যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যেভাবে কাজ চলছে, তাতে বলা যায় ভালো। অবস্থার আরও উন্নতি হবে।’
পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ- এই চারভাগে বিভক্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। প্রতিটি বিভাগেই যানজট নিরসন ও অফিসফেরত মানুষদের চলাচল স্বাভাবিক করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন স্ব স্ব বিভাগের প্রধান।
ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ড. এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে অতিরিক্ত ফোর্স দেওয়া আছে। পাশাপাশি আমাদের সিনিয়র অফিসাররা মাঠে থেকে কাজ করছেন। বিশেষ করে বেলা তিনটা থেকে ইফতারের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত আমাদের ডিসি থেকে শুরু করে সব অফিসাররা মোতায়েন থাকছেন। প্রত্যেকটি থানা এলাকায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো রয়েছে, সেখানে তারাও দায়িত্ব পালন করছেন। অফিস ছুটির পরপরই তারা সেখানে এসে ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতা করছেন।’
সন্ধ্যা ৬টার আগেই মানুষ নির্ধারিত গন্তব্যে ফিরতে পারছে জানিয়ে ড. এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘গত দুই দিনে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সাধারণ মানুষ নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে। গত দুই দিনের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুবই ভালো ছিল। আশা করি, পুরো মাসেই এ ব্যবস্থাপনা থাকবে।’
ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার লিটন কুমার সাহা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেট্রোরেলের কারণে গাড়ির গতি কমেছে। আমরা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসেছি। তাদের কার্যক্রমকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে দিয়েছি। আমাদের বিকল্প রাস্তাগুলো ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছি। ফার্মগেট থেকে সাতরাস্তা, সোনারগাঁও থেকে পান্থপথ হয়ে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তাটা ব্যবহার করছি। যেসব স্থানে জেব্রা ক্রসিং ছিল না, সেখানে জেব্রা ক্রসিং করে দিয়েছি, যাতে পথচারীরা সহজে পারাপার হতে পারেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে আমাদের ডিপ্লোয়মেন্ট রয়েছে। সঙ্গে আছে কমিউনিটি পুলিশিং ও মেট্রো রেলের প্রতিনিধিরা। আমরা বিভিন্ন বাস মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে সোনারগাঁও ক্রসিং থেকে খালি গাড়ি এনে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা করেছি। এতে করে বাসের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।’
ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার প্রবীর কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত ডিপ্লোয়মেন্টের (মোতায়েন) সঙ্গে অনেক ফোর্স- অফিসার যোগ করা হয়েছে। পিএমও থেকে আমাদের বিভাগের ৪০ জন অতিরিক্ত ফোর্স দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের এগারটি পয়েন্টে ক্রাইমের পেট্রোল পার্টি ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তা করছে। বেলা ৩টা থেকে জায়গায়-জায়গায় আমাদের সিনিয়র অফিসাররা রাস্তা থেকে যান চলাচল ম্যানেজমেন্ট করছে।’
যানজট কমানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে প্রবীর কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই। নিয়মিত ফোর্সের পাশাপাশি সিনিয়র অফিসাররা চেষ্টা করছেন। হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টাও করছি।’
ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম মুরাদ আলি বলেন, ‘আমাদের এখানে মার্কেট, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল কেন্দ্রিক আলাদা ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। এসব স্থানে বাড়তি ফোর্স ডিপ্লোয়মেন্ট করা হয়েছে। আমাদের ফোর্স শতভাগ ডিপ্লোয়মেন্ট করা হয়েছে। আমরা সিনিয়ররা সবাই মাঠে থেকে কাজ করছি, যাতে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরে ইফতার করতে পারেন সাধারণ মানুষ।’
তারপরও পুরোপুরি নির্বিঘ্ন করা যাচ্ছে না উল্লেখ করে এস এম মুরাদ আলি বলেন, ‘এখানে কিছু বাস্তবতা আছে। মেট্রোরেলের কাজ চলছে। কোথাও দুই তৃতীয়াংশ, কোথাও অর্ধেক দখল করে আছে। এছাড়া ওয়াসা, ডিপিডিসির খোঁড়াখুঁড়ি আছে। এসব বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
৭ ও ৮ মে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, অফিস শুরুর আগে নিয়মিত যানজট থাকে রাজধানীর অধিকাংশ সড়কে। বেলা ১০টার দিকে কিছুটা সময় সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও দুপুর থেকে যানজট বেড়ে যায়। এ অবস্থা চলে বিকাল পর্যন্ত। তবে বিকালের যানজট আগের তুলনায় কমেছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
৭ মে সোনারগাঁও সিগন্যালে কথা হয় মিরপুরের বাসিন্দা নিশাদ পিয়াসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অফিস থেকে বাসায় ফিরতে আগে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত। এখন কিছু কম লাগছে। তবে দুপুরে যানজট বেশি থাকে।’
একই কথা জানান, পল্টন মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা উত্তরার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাসায় যাওয়ার সময় শাহবাগ মোড়ের আগে, কাওরান বাজার ও বনানীতে জ্যামে পড়তে হয়। কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে কিছুটা কমেছে।’
বিকালে যান চলাচলের গতি বাড়লে বাসের সংকট থাকে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। তারা জানান, প্রতিটি মোড়েই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে বাসে ওঠা যায় না। এটার জন্যও সময় নষ্ট হচ্ছে।
উল্লেখ্য, রমজান মাসজুড়ে যানজট সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে নানা ধরনের সমস্যার কথা উঠে আসে। সেগুলো সমাধানে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ এপ্রিল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাস মালিকদের সংগঠন, চালক সমিতি, মেট্রোরেল রেল কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা ও বিভিন্ন মার্কেট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে, খুব জরুরি না হলে রাস্তায় যেন ওয়াসা খোঁড়াখুঁড়ি না করে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, মার্কেট বা শপিং মলে সামনে গাড়ি পার্কিং করতে না দেওয়া, ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা, ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ করা। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশা-ভ্যান চলাচল করতে না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।সাধারণ মানুষ যাতে দ্রুত সময়ে ইফতারের আগে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য কাজ করতে ট্রাফিক বিভাগকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। অফিস শেষে জনগণের বাড়ি ফেরার সময়ে ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাস্তায় উপস্থিত থেকে যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
নির্দেশনা অনুযায়ী, রোজার প্রথমদিন থেকেই কাজ শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। পরিকল্পনা মোতাবেক সফলতাও আসছে বলে দাবি তাদের। অফিস ছুটির পর দ্রুত সময়ের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারছেন নগরীর বাসিন্দারা। অফিসফেরত মানুষদের সড়কে দুর্ভোগ পুরোপুরি নিঃশেষ করা না গেলেও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে দাবি ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতনদের।








