আমরা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিনি তাকে তৈরির পেছনে বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে জমিদারি দেখাশোনা করতে এসে তিনি নিবিড়ভাবে কৃষকদের সঙ্গে মিশেছেন। তার সাহিত্যে যেমন সেসব গল্প ও চিত্রকল্প উঠে এসেছে তেমনই কৃষকদের জন্য কবির ভাবনার দুয়ারও খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। নোবেলের টাকা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এশিয়াতে প্রথম কৃষি ব্যাংকও প্রবর্তন করেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৮ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত বিশেষ বক্তৃতায় এ মন্তব্য করেছেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ।
রবিবার (১২ মে) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ মিলনায়তনে এ বিশেষ বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ এই বক্তৃতার মূল বক্তা ছিলেন। ডাকসু যে ধারাবাহিক বক্তৃতামালা এবং পাঠচক্র আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে এটি ছিল তার প্রথম পর্ব।
ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ তার বক্তৃতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের বিভিন্ন দিক আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিনি তাকে তৈরির পেছনে বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জমিদারি দেখতে পাঠালেন রবীন্দ্রনাথকে এপার বাংলায়। সেই রবীন্দ্রনাথকে তৈরির পেছনে বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষকদের কাছে তিনি অনেক প্রিয় হয়ে উঠলেন। নৈশ বিদ্যালয় তৈরি করলেন তাদের সাক্ষরজ্ঞান দেওয়ার জন্য। কৃষকের উন্নয়নের জন্য সমবায় প্রথা চালু করলেন।’
ড. ঘোষ আরও বলেন, ‘আজকে ভিন্ন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা করবো। এই রবীন্দ্রনাথের পেছনে আরেক রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন, যিনি বর্তমানে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। কৃষকের বন্ধু রবীন্দ্রনাথ, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কৃষক অন্ন জুগিয়ে দেন। একশ’ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ কৃষকের উন্নয়নের কথা বলেছেন। সুদ ছাড়া কৃষকদের টাকা ধার দিতেন। এশিয়াতে প্রথম কৃষি ব্যাংক তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন নোবেলের অর্থ দিয়ে। ছেলে রথীন্দ্রনাথকে লন্ডনে পাঠান কৃষি বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জনের জন্য। ‘দি কো-অপারেটিভ প্রিন্সিপাল’ নামক বইও লেখেন তিনি কৃষকদের প্রয়োজনে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, ‘বৃক্ষবন্দনার কবিতা লেখেন, গাছ রোপণের জন্য কবিতা লেখেন। এই রবীন্দ্রনাথের এখন খুব দরকার। তুমি কি শুধুই নেবে, কিছু দেবে না? সবকিছুই কী আত্মসাৎকেন্দ্রিক?’
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানটিকে ভালো চোখে দেখেননি কলকাতার হিন্দু এলিটরা এমন কথা প্রচলিত থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্রনাথ, এই তথ্য সঠিক নয়।
বক্তৃতা অনুষ্ঠানে প্রো-উপাচার্য ডক্টর মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘নালন্দা, তক্ষশীলা বৌদ্ধবিহারগুলোতে শিক্ষাদান কার্যক্রম ছিল ইউরোপের পূর্বেও। ভারতবর্ষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার বিষয়গুলো রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছিলেন।
উপ-উপাচার্য বলেন, সকল মতের প্রতি সহাবস্থান হওয়ার শিক্ষা রবীন্দ্রনাথের জীবন থেকে পাই। তিনি ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা করেই বড় হয়েছেন। ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘আজকালকার দিনে শিক্ষক, দোকানদার, ছাত্র খরিদ্দার।’ রবির এই বক্তব্য বর্তমানে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
ডক্টর মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের সময় প্রায় সব প্যানেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধের পক্ষে বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাঁচানোর এই শিক্ষা রবীন্দ্রনাথ কাছ থেকে নিতে হবে। তিনি শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে অপপ্রচার ঠিক নয়। তাঁকে যথাযথ সম্মান দেওয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করলে ১৯২৬ সালে তাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ করা হতো না।
ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক মাজহারুল কবির শয়নের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। এতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহদী আল মুহতাসিম নিবিড়, ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসিফ তালুকদার, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক শামস-ই-নোমান ও ডাকসুর সদস্যবৃন্দসহ আরও অনেকে।








