রাজধানীর লালবাগের আজিমপুর পুরাতন কবরস্থান মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদের খাদেম মো. হানিফ শেখ (৩০) সহকর্মীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণেই খুন হয়েছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। নিহত হানিফ শেখ মসজিদের সব কাজ নিয়মিত করতেন। কিন্তু পলাতক ও অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম (৩৮) ঠিকমতো কাজ করতেন না। এ নিয়ে মসজিদের কমিটির কাছে নালিশ দিয়েছিলেন হানিফ। এরপর কমিটি সাইফুলকে সতর্ক করে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন সাইফুল। এছাড়াও কাজে ভালো করায় হানিফের চাকরি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এসবের জেরে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। শনিবার (৬ জুলাই) তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে লালবাগ থানার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘হানিফ শেখ বেশ কয়েক বছর ধরে মসজিদে খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। হানিফ ছাড়াও মসজিদে বাহার উদ্দিন (৫৫), ফরিদ আহমেদ (৪০) নামে আরও দুজন খাদেম রয়েছেন। তাদের সঙ্গে সাত-আট মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে আসা সাইফুল ইসলাম (৩৮) কাজ শুরু করেন। মসজিদের দোতলার একটি কক্ষে তিনজনই একসঙ্গে থাকতেন। তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে তাদের একজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। তাদের চাকরি স্থায়ী ছিল না। হানিফ কাজে ভালো হওয়ায় এবং মসজিদের শুরু থেকে কাজ করায় তার চাকরি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পলাতক সাইফুল চেয়েছিল তার চাকরি স্থায়ী হোক। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল।’
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সাইফুল কাজে ফাঁকি দিতেন। বিষয়টি মসজিদের ইমাম ও কমিটিকে জানিয়েছিল নিহত হানিফ। এ নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে ঝগড়াও হয়। এমনকি রাতে সাইফুল মসজিদে থাকতেন না। ভোরে বাসায় এসে গোসল করতেন। এ বিষয়েও কমিটিকে জানিয়েছিলেন হানিফ। এসব বিষয় নিয়ে মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে হানিফ শেখকে সাইফুল খুন করতে পারে বলে পুলিশের ধারণা।’
গত বুধবার লালবাগ থানার আজিমপুর কবরস্থানসংলগ্ন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদের খাদেমদের থাকার কক্ষের পাশের একটি বারান্দা থেকে খাদেম হানিফ শেখের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় হানিফের শ্বশুর জাকির শেখ বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে লালবাগ থানায় ৪ জুলাই হত্যা মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামি সাইফুলের বাবার নাম শফিকুল গ্রাম। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ থানার মশাই গ্রামে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন– মসজিদটির খাদেম ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার শালন্দী গ্রামের বাহার উদ্দিন (৫৫), খাদেম ও ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুরের মো. ফরিদ আহমেদ (৪০) এবং নিউমার্কেট জামে মসজিদের খাদেম আবুল কালাম আজাদ (৪৫)। সাইফুল ছাড়া বাকি সব আসামি গ্রেফতার হয়েছে।
লালবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সাইফুলের পরিচিত নিউমার্কেট জামে মসজিদের খাদেম আবুল কালাম আজাদ। হানিফকে হত্যার পর তাকে ফোন দিয়েছিলেন সাইফুল। লাশ গুম করার জন্য এই ফোন দিয়েছিলেন সাইফুল। এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন গ্রেফতার আবুল কালাম আজাদ।’
খাদেমরা একই কক্ষে থাকার পরও হত্যার বিষয়ে কেউ কিছু দেখেননি বলে দাবি করেছেন। তবে মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে তারা সাইফুলকে একটি বস্তা নিয়ে দোতলায় উঠতে দেখেছেন। এ বিষয়ে পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘একজন ব্যক্তির পক্ষে এভাবে খুন করে বস্তাবন্দি করা সম্ভব না। এক তরুণকে ঘটনার দিন মসজিদে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। আমরা তাকেও খুঁজছি। তবে তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।’
হত্যা মামলায় গ্রেফতার তিন আসামিকে শনিবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে (সিএমএম) হাজির করা হয়। আদালত প্রত্যেক আসামির তিন দিন করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন। তিন আসামি হলেন– বাহার উদ্দিন (৫৫), ফরিদ আহম্মেদ (৫০) এবং আবুল কালাম (৪৫)।
লালবাগ জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. সালাহউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিহত হানিফের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ ছিল। এ নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। তবে সাইফুলকে গ্রেফতারের পর হত্যার কারণ জানা যাবে। আমরা ইতোমধ্যে সাইফুলের বাড়ি ও সম্ভাব্য স্থানে অভিযান চালিয়েছি। তবে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। আমরা চেষ্টা করছি।’
মামলার বাদী নিহত হানিফ শেখের শ্বশুর জাকির শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাইফুলের সঙ্গে হানিফের মসজিদে ঝাড়ু দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঝামেলা চলছিল। সাইফুল কাজে ফাঁকি দিতো। সেটি বলায় ঘটনার দুই দিন আগে তাকে তেড়ে গিয়েছিল সাইফুল। আমরা মঙ্গলবার হানিফের কোনও সন্ধান পাচ্ছিলাম না। তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। আমাকে আমার থানা থেকে ফোন দিয়ে মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। আমি জামাই হত্যার বিচার চাই।’
মসজিদের সভাপতি মেয়র সাঈদ খোকনকে এ বিষয়ে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দিয়ে থাকি। এছাড়া স্থানীয়রা দান, অনুদান দিয়ে থাকেন। এভাবে ব্যয় নির্বাহ করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ বিষয়টির তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ তদন্তে হত্যার কারণ জানা যাবে।’








