ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় মিজান-বাছিরের বিরুদ্ধে মামলা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৬ জুলাই ২০১৯, ১৬:০০আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৯, ২০:০৪

পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাস্ত পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির চল্লিশ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাস্ত পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় ঘুষ লেনদেন নিয়ে কথোপকথনের অডিও’র সত্যতা পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলো। মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। এদিনই মামলার অনুমোদন দেয় দুদক। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে বাছিরকে গ্রেফতার করা হতে পারে।

মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছে :

মামলার এজাহারে বাদী বলেন, ‘দুদকের বরখাস্ত পরিচালক বাছির নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। মিজান দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য বাছির ঘুষ দিয়েছেন। আর এসব করে দু’জন-ই দণ্ডবিধির ১৬২/১৬৫ (ক)/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২)(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, নথিপত্র পর্যালোচনা, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ফরেনসিক প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মিজানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গত বছরের ২৫ নভেম্বর বাছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি কাজ শুরু করেন গত বছরের ২৯ নভেম্বর।

দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত করা হয় তাকে। (ফাইল ছবি)

অনুসন্ধান চলাকালে চলতি বছরের ৯ জুন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হয় যে, মিজান তার বিরুদ্ধে চলা অনুসন্ধান প্রভাবিত করতে দুদক পরিচালক বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। বিষয়টি দুদকের নজরে আসলে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে বাছিরের বক্তব্য নেয়। পরে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত বলে প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে গত ১৩ জুন বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়।

অনুসন্ধানকলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, এনটিএমসি হতে বিশেষজ্ঞ মতামত ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মিজান ১৫ জানুয়ারি একটি বাজারের ব্যাগে কিছু বইসহ পঁচিশ লাখ টাকা নিয়ে রমনা পার্কে যান এবং বাছিরের সঙ্গে আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে আলোচনা শেষে দু’জনই রমনা পার্ক থেকে বের হয়ে শাহজাহানপুর এলাকায় যান। এসময় মিজান টাকার ব্যাগটি বাছিরের হাতে দেন। এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি মিজান দ্বিতীয় দফায় ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দেওয়ার জন্য আবারও রমনা পার্কে যান। সেখানে দু’জন আলোচনা শেষে পার্ক থেকে বেরিয়ে শান্তিনগর যান। সেখানে শপিং ব্যাগে নিয়ে আসা ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দিয়ে শান্তিনগর থেকে চলে যান মিজান।

এজাহারে বলা হয়েছে, বাছির ও মিজানের বিভিন্ন সময়ের কথোপকথন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাছির তার ছেলেকে ঢাকার কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা নেওয়ার জন্য মিজানের কাছে একটি গাড়ি দাবি করেছেন। গাড়ি চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বিভাগীয় তদন্ত টিমের কাছে বক্তব্যও দিয়েছেন বাছির।

এজাহারে বলা হয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংগৃহীত/প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র, এনটিএমসি’র কাছ থেকে পাওয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, মিজান ও বাছির উভয়ে বেআইনিভাবে দুটি পৃথক সিম ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওই সিম দুটি মিজানের বডিগার্ড মো. হৃদয় হাসান ও অর্ডারলি মো. সাদ্দাম হোসেনের নামে কেনা হয়। মিজানের ভাষ্যমতে, তিনি ০১৪০১৯৪৪৯১৫ নম্বরের সিমটি ব্যবহারের জন্য বাছিরকে একটি স্যামসাং মোবাইল কিনে দেন। অনুসন্ধান কালে এনটিএমসি’র প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ সিমটি একটি স্যামসাং মোবাইলে ব্যবহৃত হয়েছে। যার মডেল স্যামসাং এসএম – বি৩১০ই, স্যামসাং কোরিয়া, জিএসএম ৯০০, জিএসএম ১৮০০। মোবাইলটি ডিআইজি মিজানের বডিগার্ড হৃদয় হাসান বিগত ৯ জানুয়ারি বনানী সুপার মার্কেট থেকে কিনেছেন। মিজানের ভাষ্যমতে, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ সিমটি তার বডিগার্ড হৃদয় হাসানের নামে তারই নির্দেশে, তারই টাকায় কেনা হয়েছে।

মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্যে মতে, সিমটি হৃদয় হাসানের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। মিজানের বডিগার্ড হৃদয় ৯ জানুয়ারি বনানী সুপার মার্কেট থেকে সিমটি কেনেন। পরে ১০ জানুয়ারি মিজান সিমসহ মোবাইল সেটটি বাছিরকে দেন। অন্যদিকে মিজানও তার অর্ডারলি সাদ্দাম হোসেনের নামে সিম (০১৯৭৪৫৫৬৫৫১) কেনেন। এবং তা দিয়ে বাছিরের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখতেন। তারা এক অপরের মধ্যে এসএমএস চালাচালিও করতেন। অনুসন্ধানকালে আরও প্রমাণিত হয়, মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঘুষ লেনদেনের কথোপকথন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

অভিযোগ অনুসন্ধানকালে, বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য, অডিও রেকর্ডে উভয়ের কথোপকথন ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে প্রমাণিত হয় যে, নিজে অভিযোগের দায় হতে বাঁচার জন্য মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে ঘুষ দিয়ে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাছির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দুদক থেকে পাওয়া দায়িত্ব পালন করেননি। অসততার প্রমাণ দিয়েছেন। যা দণ্ডবিধির ১৬১ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

একইভাবে মিজানও সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজের বিরুদ্ধে উঠা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায় অর্থাৎ অনুসন্ধানের ফলাফল নিজের পক্ষে নেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন। যা দণ্ডবিধির ১৬৫ (ক) ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এমতাবস্থায়, বাছির ও মিজানের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫ (ক)/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করার জন্য অনুরোধ করা হলো। মিজান ও বাছির একে অপরকে প্রভাবিত করার সময়কাল : গত বছরের ২৯ অক্টোবর থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত।’

প্রসঙ্গত, ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১৫ জুলাই কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। আর ১০ জুলাই এ বিষয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামাল হোসেনের মাধ্যমে দুদকে লিখিত বক্তব্য জমা দেন বাছির। মিজান ও বাছিরের ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান কমিটি গঠন হয় ১৩ জুন। তিন সদস্যের এ কমিটির প্রধান দুদক পরিচালক শেখ মো.ফানাফিল্যাহ। অন্য দুই সদস্য হলেন-সংস্থাটির সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাউদ্দিন।

গত ৯ জুন মিজান-বাছিরের ঘুষ লেনদেনের কথোপকথনের একাধিক অডিও প্রকাশ করেন মিজান। এ বিষয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদনও প্রচার হয়।

ডিআইজি মিজানকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেওয়া হচ্ছে। (ফাইল ছবি)
আর গত ২৩ জুন বাংলা ট্রিবিউনে ‘লন্ডন প্রবাসী দয়াছের অডিও সংলাপে দুদকের ওরা কারা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের অডিও সংযুক্ত করা হয়। ঘুষ লেনদেন নিয়ে লন্ডন প্রবাসী আব্দুল দয়াছ, ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভূইয়ার মধ্যকার ওই অডিও সংলাপে ৬ জনের নাম আলোচিত হয়। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ঘুষ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
এ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদকের সাবেক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভূইয়া ও জায়েদ হোসেন খানকে ৩০ জুন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

 

/ডিএস/এপিএইচ/টিএন/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঢাকায় ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে কোন ওয়ার্ড
ঢাকায় ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে কোন ওয়ার্ড
বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, নিয়োগ পেলেন তিন কমিশনার
বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, নিয়োগ পেলেন তিন কমিশনার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয়ে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয়ে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের