২০১৬ সালে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার আবাসিক হোটেলের মালিক রফিকুল ইসলাম জুনায়েতকে (৪০) হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই সময় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে সন্ত্রাসীরা মোবাইলফোনে কথা বলতে গিয়ে সাংকেতিক ভাষায় পিস্তলকে ‘বই’ এবং গুলিকে ‘কয়েন’ বলে উল্লেখ করে। ঘটনার তিন বছর পর হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতারের পর পিবিআই ঢাকা মেট্রো এই তথ্য জানতে পেরেছে। মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) পিবিআই ঢাকা মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানান।
তিনি জানান, ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাতে ১১২ দক্ষিণ বিশিল নিউ শাহজালাল আবাসিক হোটেলের মালিক রফিকুল ইসলাম জুনায়েত (৪০) দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন। পাইকপাড়া সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের ফুটপাতে তার লাশ পড়েছিল। এই ঘটনায় নিহতের বড়ভাই ডা. সাঈদ হোসেন সোহাগ (৩২) বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে দারুস সালাম থানায় মামলা করেন। মামলাটি থানা পুলিশের পর ডিবি পুলিশ তদন্ত করে।
থানা পুলিশ মামলাটি তদন্তকালে হত্যার সঙ্গে জড়িত আসামি সোহেল ওরফে শুটার সোহেল (৩৫) ও শেখ মৃদুল ওরফে বাবু ওরফে মির্জাকে (৩৪) গ্রেফতার করে। এরই মধ্যে ডিবি ঢাকা মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। পরে ঘটনায় জড়িত আব্দুর রহিম ও আনোয়ার হোসেন পলাশকে গ্রেফতার করে মামলাটির তদন্ত শেষে ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে ডিবি। তবে তারা প্রধান দুই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
পরে প্রধান আসামি গ্রেফতার ও ঘটনার মূল কারণ উদঘাটন না হওয়ায় বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করেন। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। এরপর পিবিআই মামলাটি তদন্ত শুরু করে। সোমবার (২৯ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার দিকে যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকা থেকে আসামি আনোয়ার হোসেন সবুজ ওরফে সজিব ওরফে শুটার সবুজকে (২২) গ্রেফতার করে পিবিআই সদস্যরা। গ্রেফতারের পর সবুজ মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
পিবিআই জানায়, ভিকটিম রফিকুল ইসলাম জুনায়েতের বাবা বিল্লাল হোসেন ১৯৯৭ সালে শাহজালাল আবাসিক হোটেল ক্রয় করে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তবে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই স্থানীয় চাঁদাবাজ শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহদাত গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড আসামি আনোয়ার হোসেন সবুজ ওরফে সজিব ওরফে শুটার সবুজসহ তার সহযোগী আসামি সোহেল ওরফে শুটার সোহেল, শেখ মৃদুল ওরফে বাবু ওরফে মির্জা, আব্দুর রহিম ও আনোয়ার হোসেন পলাশ হোটেল থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহদাতের নাম করে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতো। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে সন্ত্রাসী গ্রুপটি ভারতের একটি নম্বর দিয়ে জুনায়েতকে ফোন দিয়ে এককোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে জুনায়েত অস্বীকার করলে, দাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর হুমকি অনুযায়ী সন্ত্রাসীরা তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আসামি শুটার সবুজ তার সহযোগী আসামিদের সিমসহ কয়েকটি মোবাইলফোন দেয়। সে নিজের কাছে একটি মোবাইলফোন রাখে। ওই ফোনগুলো দিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে এবং শাহজালাল হোটেলের মালিক ভিকটিম জুনায়েতকে নজরদারিতে রাখে। সন্ত্রাসী গ্রুপটি নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানের সময় আগ্নেয়াস্ত্র পিস্তলকে সাংকেতিক শব্দ ‘বই’ এবং পিস্তলের গুলিকে ‘কয়েন’ বলতো।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে ১ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে সন্ত্রাসীরা শুটার সবুজের বাসায় একত্রিত হয়। পরে সবুজের নেতৃত্বে তারা পিস্তলসহ পাইকপাড়া স্টাফকোয়ার্টারের ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে জুনায়েত নিজ বাসায় যাওয়ার সময় পাইকপাড়া সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার সামনে হামলার শিকার হন। সবুজের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা জুনায়েতের ওপর হামলা চালায়। এ সময় সবুজ তার হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে জুনায়েতের বুকে গুলি চালায়। গুলিতে জুনায়েতের মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা পূর্ব পরিকল্পনা মতে সবাই গুদারা ঘাট বটতলার দিকে চলে যায়। রাতে সবাই তাদের মোবাইলফোন তুরাগ নদীতে ফেলে দেয়।








