বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সর্বসাধারণ যদি সতর্ক না হয় তবে শিগগিরই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘ডেঙ্গু’ শীর্ষক বৈঠকিতে এই মত প্রকাশ করেন তারা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) বিকালে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।
এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্যানেল মেয়র আলেয়া সারোয়ার ডেইজী বলেন, ‘এখনকার ডেঙ্গুটা একটু অন্যরকম। আমাদের ঘরের ভেতরে পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা হচ্ছে। আমরা যদি নিজেরা সচেতন না হই, তাহলে এ সমস্যা থেকে পরিত্রান পাবো না। আমি জানি সবার অনেক ব্যস্ততা আছে। তবে আমাদের দায়ভার এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। আমাদের মানতেই হবে কোথাও না কোথাও আমাদের অবশ্যই দুর্বলতা আছে।’
আলেয়া সারোয়ার ডেইজী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘যে যাই ভাবুক, এই সমস্যা নিয়ে আমি কাজ করতে চাই, এটাই বাস্তবতা। ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগে সচেতনতার জন্য আমরা অনেক ধরনের প্রোগ্রাম করেছি। আমার চেষ্টা ছিল। আপনারা এর আগে দেখেছিলেন যে, মশার কারণে বিমানের ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়েছিল। যদিও সিভিল অ্যাভিয়েশনের দায়িত্ব ছিল এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার। আমি সেই সময় কাজ করতে গিয়ে এক ধরনের আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে পড়েছিলাম।’
শিগগিরই ভয়াবহভাবে সারাদেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সামনে ঈদ আসছে। তখন ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকা ঢাকা থেকে ভাইরাস সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। যদি আমরা এখনই সতর্ক না হই, সামনে হয়তো মহাদুর্যোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।’
ডেঙ্গুর বর্তমান ভয়াবহতার কথা তুলে ধরে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা একটি বরফের টুকরোর ভাসমান অংশ দেখছি, ডুবে থাকা অংশ কিন্তু দেখছি না। একটি গণমাধ্যম যখন লিখলো– “ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ”, আমরা কিন্তু তার বিরোধিতা করিনি। যদিও মেয়র সাহেব এ নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আমরা জানি, হাসপাতালে ভর্তির বাইরেও বিপুল সংখ্যক রোগী থাকে। আমরা যা দেখছি তার পেছনের দৃশ্য আরও ভয়াবহ।’
‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি অনুযায়ী এটি মহামারি।’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মহামারি ঘোষণা করা নীতিনির্ধারকদের ব্যাপার। নীতিনির্ধারকদের একটা জেদ থাকে– তারা পরাজিত হতে চান না। যেমন মেয়র সাইদ খোকন বলছেন– “সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে।” আমার কাছে মনে হয়– এ ধরনের জায়গায় যারা আছেন, এক ধরনের ইগো তাদের মধ্যে কাজ করে। এখানে ব্যর্থ হওয়া না হওয়ার ব্যাপার নয়।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ‘এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা অনেক জায়গায় আছে। তবে এক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে সিটি করপোরেশনকে দোষারোপ করা যায় না। এজন্য নগরবাসীরও অংশগ্রহণ দরকার। কারণ আমাদের ঘরে কিংবা বাথরুমে জমে থাকা পানিতে সিটি করপোরেশনের লার্ভা মারার ওষুধ দেওয়া যায় না।’ এ বিষয়ে কবিরুল বাশার আরও বলেন, ‘ডেঙ্গুর “এটিচিউড” নিয়ে আমার একটি জার্নাল প্রকাশ হয়েছে। আমরা সাত-আটশ’ লোকের ওপর ঢাকা শহরে স্টাডি করেছি। এ সময় আমরা বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করেছি। তাতে দেখি ঢাকা শহরের ৮০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গু এবং ডেঙ্গুর মশা যে এডিস জানে এবং তারা এটাও জানে যে, এই মশা পাত্রে জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয়। তবে সাধারণ মানুষের এই মশা নিয়ে কোনও “প্র্যাকটিস” নেই। আমাদের এটিচিউড ভালো, কিন্তু প্র্যাকটিসে গিয়ে কিছু করছি না। এখন দোষ কারও ওপর চাপাতে হবে।’
এডিস মশার বিস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এডিস মশা ঢাকা শহরে দু’ ধরনের। একটিকে এডিস এলবোপিকটাস বলে, আরেকটিকে এডিস ইজিপটাই বলে। ইজিপটাইটা আমাদের বিজ্ঞান অনুযায়ী ৯৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগের জন্য দায়ী, আর এলবোপিকটাস ৫ শতাংশ দায়ী। এলবোপিকটাস রোগ ছড়ায় যখন মহামারির পর্যায়ে চলে যায়। সাধারণ মানুষ চোখে দেখে আলাদা করতে পারবেন এই দুই জাতের মশা। এলবোপিকটাস একটু জংলি প্রজাতির মশা। এজন্য এটিকে এশিয়ান টাইগারও বলা হয়। আর ইজিপটাইটা হলো গৃহপালিত মশা। ইজিপটাইটা ঘরের আশেপাশে থাকতে পছন্দ করে, এটা তার চরিত্র। যেহেতু ঘরের এবং বাইরের পানি জমা পাত্রে বংশবৃদ্ধি করে সেক্ষেত্রে তার চান্স বেড়ে যায় রোগ ছড়ানোর।’
প্রশাসন ডেঙ্গুর বিষয়টিকে শুরুর দিকে গুরুত্ব দেয়নি মন্তব্য করে ব্লগার ও অ্যাক্টিভিস্ট বাকি বিল্লাহ বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে যে সময় প্রশাসনের যথাযথ সচেতনতার মনোভাব এবং পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল, সে সময় তারা একটি “অস্বীকারের রাজনীতি” করছিল।’
তিনি বলেন, ‘তিনি বলেন, একটি রোগ যখন মহামারির পর্যায়ে তখন সাধারণ মানুষ শকড হবে না, এটা আশা করা যায় না। ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে মহামারি হিসেবে দেখার আগে জরুরি বিষয় হলো, এটাকে যথাযথভাবে সবাইকে জানানো। মানে প্রশাসনের অ্যাটিচিউডটা কী হবে? অথচ কীভাবে জিনিসটাকে এড়ানো যায়, তারা সেই বুদ্ধি করার তালে ছিল। এখানে প্যানেল মেয়র ডেইজি আপা বলছিলেন, “ঘরের ভেতর তো সিটি করপোরেশন ঢুকতে পারবে না।” কিন্তু সেই মনোভাবটা তো থাকতে হবে আগে। যদি তাদের মনোভাব বিপদটাকে মোকাবেলা করার মতো হয়, সেখানে অনেক ধরনের করণীয় চলে আসে।’
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের সিনিয়র রিপোর্টার জাকিয়া আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহের চেয়ে এই সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পাঁচ গুণ বেশি। ২০১৮ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৪৮। এ বছর গতকালের (সোমবার) হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে।’ সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আরও বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করে জাকিয়া আহমেদ বলেন, ‘আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা বলেছে, আগস্ট ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়ের মাস। সে সময় এর প্রকোপ বাড়বে। এই মুহূর্তে কোনও হাসপাতালে বেড খালি নেই। আমি গত সপ্তাহে কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরলাম, মালিবাগের একটি হাসপাতালে গিয়ে রিসেপশনে জানতে চাইলাম, তারা ডেঙ্গু রোগীদের কোথায় রেখেছেন। তারা জানালেন, পুরো হাসপাতাল জুড়ে। প্রথম দিকে কিছু কিছু হাসপাতাল আলাদা করে রাখার চেষ্টা করেছিল, পরে আর সেটা সম্ভব হয়নি।’
রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা গেছে এ আয়োজন।








