সিটি করপোরেশনের পক্ষে মশা নিধনের ওষুধ আনতে লাইসেন্স নিতে হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, অনুমোদন নিতে হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এবং ছাড়পত্র দরকার হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের। ওষুধ আনা নিয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর এমন ধাক্কাধাক্কি চলতে থাকলে দেশে মশা মারবে কে?—এমন প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ প্রশ্ন তোলেন।
আদালতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান।
শুনানিতে দুই সিটি করপোরেশনের আইনজীবীদের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা উচিত ছিল। কিন্তু আপনারা তা করেননি। আদালত রুল জারির পর আপনাদের ঘুম ভেঙেছে। তারপর উল্টাপাল্টা বলতে লাগলেন। পরে সরকারের ধমক খেয়ে চুপ হলেন। মশা নিধনের বিষয়টি আপনারা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন না।’
এ সময় আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু আদালতকে বলেন, ‘মশা নিধনে প্রতি ওয়ার্ডে লোকবল বাড়ানো হয়েছে।’ এ সময় আদালত বলেন, ‘আমাদের ধারণা, যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, তাতে কোনও কাজ হচ্ছে না। এ জন্য বিভিন্ন মহল থেকে অধিক কার্যকর ওষুধ ছিটানোর কথা বলা হচ্ছে। আপনার রাইফেল আছে, গুলি নেই। এমন রাইফেল থেকে কী লাভ?’
জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘চীন থেকে ওষুধ আনা হবে। সিটি করপোরেশন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’ তখন আদালত বলেন, ‘আপনাদের এই কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।’
আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু বলেন, ‘সারা বছরই মশা নিধন কার্যক্রম চলে। এখন মশার প্রকোপ বেড়েছে।’ আদালত প্রশ্ন করেন, ‘সারা বছর কার্যক্রম চললে প্রকোপ বাড়বে কেন?’
জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘নতুন একটি ওষুধ আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার হয়তো লাইসেন্সটা পেয়ে যাবে। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে হয়তো ওষুধ চলে আসবে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে বিষয়টি মনিটর করা হচ্ছে।’ আদালত বলেন, ‘ভারতেও ওষুধ রয়েছে। সেখান থেকে দ্রুত ওষুধ আনা যেতে পারে।’
রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মাইনুল হাসানকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, ‘ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার লাভ করছে। এ ব্যাপারে সরকার কী করছে? আমরা কি প্রত্যেক দফতরের লোকদের ডেকে এনে তাদের বক্তব্য শুনবো?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু বর্তমানে যে আকার ধারণ করেছে, তাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রণে রাখার। এই প্রচেষ্টা গ্রহণ করা না হলে আরও বড় আকার ধারণ করতো। তবে পুরানো ওষুধ যথেষ্ট কার্যকর নয়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে।’
একপর্যায়ে উভয়পক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, সিটি করপোরেশনের পক্ষে মশা নিধনের ওষুধ আনতে লাইসেন্স নিতে হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, অনুমোদন নিতে হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এবং ছাড়পত্র দরকার হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের। তখন আদালত বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ঢাকার মশা মারবে সিটি করপোরেশন। এ ক্ষেত্রে ওষুধ আনা নিয়ে যদি মন্ত্রণালয়গুলোর এমন ধাক্কাধাক্কি চলতে থাকে, সারাদেশের মশা মারবে কে? আমরা নতুন ওষুধ ক্রয় নিয়ে কোনও দফতর বা বিভাগের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি দেখতে চাই না।’
ডিএনসিসির আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা আদালতকে বলেন, ‘বর্তমান অবস্থায় সরকার দুই সিটি করপোরেশনকে নতুন ওষুধ এনে দিলে ভালো হয়। তাহলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না।’
এরপর আদালত মামলাটির শুনানি শেষ করে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিধনে কার্যকরী ওষুধ কবে দেশে আসবে তা সরকার এবং ঢাকার উভয় সিটি করপোরেশনকে আগামী বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) দুপুর ২টার মধ্যে জানানোর নির্দেশ দেন।








