কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় স্মৃতি আক্তার রিমা (১৪) নামের এক কিশোরীকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর ‘হত্যা’র ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পিবিআই কিংবা র্যাবের কাছে তদন্তভার দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে নিহতের পরিবার। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা। সোমবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই আবেদন জানায় রিমার মা আঙ্গুরা খাতুন ও তার পরিবার সদস্যরা।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ধর্ষণের কথা উল্লেখ করা হলেও রিমা ‘আত্মহত্যা’ করেছে এমনটা বলা হয়েছে। এ বিষয়টিও মানতে পারছে না রিমার পরিবার। সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করেছেন, রিমাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে নিহত রিমার মা আঙ্গুরা খাতুনের অভিযোগ, আমার মেয়েকে প্রেমের জালে ফেলে প্রতারিত করে পিয়াস। এরপর ১৭ জুলাই রাতে সেসহ তার বন্ধুরা রিমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৮ জুলাই কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চর ফরাদি ইউনিয়নের গাঙ ধোয়ারচর গ্রামে নানাবাড়ির পাশের পুকুরপাড়ের একটি বরই গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। এই ঘটনায় কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৮। মামলার আসামিরা হলো- জাহিদ (২০), পিয়াস (১৮), রুমান (১৮), রাজু (১৮)সহ অজ্ঞাতনামা ৬ জন।
তিনি জানান, আসামি পিয়াসকে র্যাবের একটি দল চট্টগ্রাম থেকে ২২ জুলাই রাতে গ্রেফতার করে। র্যাবের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পিয়াস স্বীকার করে যে, স্মৃতি আক্তার রিমার সঙ্গে সে প্রেমের ভান করে সম্পর্ক গড়ে তুলে। সে এও স্বীকার করে ঘটনার দিন দিবাগত রাতে রিমাকে সু-কৌশলে ডেকে প্রথমে সে নিজে ধর্ষণ করে, তারপর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরকে দিয়ে ধর্ষণ করায়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সে একথা স্বীকার করে।
রিমার মা আরও অভিযোগ করেন, বাকি অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য বার বার অনুরোধ জানিয়েও কোনও ফায়দা হয়নি। আসামিরা কোথায় আছে সে বিষয়ে উল্টো আমাদেরকেই থানায় খবর দিতে বলা হয়। এ কারণে পুলিশ এ মামলার সঠিক তদন্ত করবে না বলে আমাদের মনে হচ্ছে।
তিনি জানান, ঘটনার দিনই কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জেলা সদর হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক ডা. সজীব ঘোষের দেওয়া ময়নাতদন্ত রিপোর্ট উল্লেখ করে জানান, রিমাকে ধর্ষণের স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে। তবে পরবর্তী সময়ে জানানো হয়, ওই চিকিৎসক নাকি ডিএনএ টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহে ব্যর্থ হন। তখন ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ‘গলায় দড়ি দিয়ে মৃত্যু’।
এই ময়নাতদন্তের বিষয়ে নারাজি দিয়ে তার প্রশ্ন, এভাবে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর রিমার পক্ষে কি সম্ভব ছিল ১০ ফুট উঁচু গাছে উঠে গলায় দড়ি দেওয়ার? আবার যখন তার লাশ পাওয়া যায় তখন দেখা যায় গলায় দড়ি দেওয়া অবস্থায় সে হাঁটু গেড়ে ছিল।
রিমার মামা মোরশেদ মিয়া বলেন, রিমাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যা করার পর তাকে বরই গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখে হত্যাকারীরা। তার দুই হাঁটু ভাঙা অবস্থায় মাটিতে লেগে ছিল। এতেই বোঝা যায়, তাকে হত্যা করে লাশ গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে আত্মহত্যা করেনি।
তিনি দাবি করেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘আত্মহত্যা’ কী করে লেখা হলো তারও তদন্ত দাবি করছি আমরা।
এ প্রসঙ্গে মোরশেদ মিয়া সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, রিমাকে হত্যার পর আসামি পক্ষের লোকজন দম্ভ করে বলেছিল যে, ‘কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে আমাদের লোক আছে, সঠিক রিপোর্ট তোমরা কোনোদিন পাবা না’। আসামিদের পরিবার প্রচুর বিত্তশালী ও প্রভাবশালী হওয়ায় সবখানেই প্রচুর অর্থ ব্যয় করার চেষ্টা করছে।
তিনি ও রিমার মা আঙ্গুরা খাতুন সংবাদ সম্মেলনে আকুল আবেদন জানান, এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামিদের গ্রেফতারে থানা পুলিশের পরিবর্তে পিবিআই অথবা র্যাবের কাছে দায়িত্বভার দেওয়া হোক। আমরা এই বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে রিমার অপর মামা মুসলেম মিয়া এবং তার বড় ভাই মাসুদ মিয়া উপস্থিত ছিলেন।








