রিকশাচালক বাবা নূর ইসলামের প্রথম ছেলে রুবেল (১১)। দুটি বড় অপারেশনের কারণে অনেকটা কর্মক্ষমতা হারানো নূর ইসলামের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষে রুবেল চাকরি করবে। তাদের দুঃখের সংসারে ফিরবে সুখ। এ জন্য ছেলের পড়ালেখার দিকে বেশি মনোযোগ দিতেন। বুধবার (৩০ অক্টোবর) স্কুল থেকে ফিরে বস্তির মাঠে বেলুনওয়ালাকে দেখে বাবার কাছে একটি বেলুনের আবদার করে রুবেল। কিন্তু ছেলের আবদার রাখতে পারেননি নূর ইসলাম। ছেলেকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রিকশা নিয়ে ফের চলে যান রাতের খাবারের অর্থ উপার্জনে। কিছু দূর না যেতেই শুনতে পান বিকট শব্দ। সেই শব্দই নূর ইসলামের স্বপ্ন ধসে পড়ার শব্দ। স্ত্রীর ফোনে তখনই ফিরে এসে দেখেন, রুবেল আর নেই। ক্ষতবিক্ষত ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে আরও কয়েকটি শিশুর সঙ্গে।
বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে রুবেলসহ ৬ শিশু নিহত হয়। বাকিরা হলো রমজান (৮), জান্নাত (১৪), নূপুর (৭), ফারজানা (৬) ও রিয়া (১০)। সবার লাশ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
ছেলের লাশের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন বাবা নূর হোসেন। এসময় তিনি বাংলা ট্রিবউকে জানান, তার চার ছেলের মধ্যে রুবেল সবার বড়। তার দ্বিতীয় ছেলে জিহাদ গত বছরের এই সময়ে গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনের ভোলার হাটের নিজেদের পুকুরে পড়ে মারা যায়। এক বছরের ব্যবধানে দুই ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন নূর ইসলাম। রূপনগর এলাকায় রিকশা চালান তিনি। অসুস্থ হওয়ায় যাত্রী নিয়ে দূরে যান না।
বুধবারও যথারীতি সকালে রুবেল স্কুলে যায়। ফিরে আসে দুপুরে। সে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রণিতে পড়তো। দুপুরে নূর ইসলাম খাবার খেতে বাসায় আসেন। এসময় বাসা থেকে বাবার সঙ্গে বের হয়ে কিছু দূর যায় রুবেল। পাড়ার মাঠে বেলুনওলাকে দেখে বাবার কাছে একটি বেলুনের আবদার করে বসে। কিন্তু বাবা নূর ইসলাম সেই আবদার রাখতে পারননি।
নূর ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুপুরে বাসায় এলে রুবেল আমার সাথে বস্তির মাঠ পর্যন্ত যায়। সেখানে একজন বেলুন বিক্রেতাকে গ্যাস ভরিয়ে বেলুন বিক্রি করতে দেখে সে আমাকে একটি বেলুন কিনে দিতে বলে। আমি অসুস্থ মানুষ। ঘরে রাতের চাউল নেই, সাথে টাকাও নেই। তাই তাকে রাতে কিনে দিবো বলে আশ্বাস দিয়ে বাসায় ফিরিয়ে দিয়ে রিকশা নিয়ে আবার বের হই।’
তিনি বলেন, ‘কিছু দূর যেতেই শুনি হঠাৎ বিকট শব্দ। ফিরে গিয়ে দেখি অনেকগুলো শিশু রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দেখি সেখানে আমার রুবেলও আছে। তার শরীর দুই ভাগ হয়ে আছে, শরীর থেকে হাড্ডি-মাংস আলাদা!’
শোকে কাতর এই বাবা আরও বলেন, ‘গত বছর আমার আরেক ছেলে জিহাদ পানিতে পড়ে মারা যায়। আমার শরীরে বড় দুটি অপারেশন করতে হয়েছে। অনেক টাকা চলে গেছে। এখন মিরপুরের রূপনগরে এসে রিকশা চালাই। চেয়েছিলাম কষ্ট করে হলেও ছেলেকে মানুষ করবো। বড় দুই ছেলেকে হারিয়েছি।’ ‘এখন কী করবো’—এই বলে আহাজারি করে ওঠেন সন্তান হারানো এই বাবা।








