মাদকবিরোধী অভিযানের পর নিরাময় কেন্দ্রে ভিড় বেড়েছে

আমানুর রহমান রনি
০৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৩:৪৯আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৮

এক মাদকসেবীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে (অনলাইন থেকে সংগৃহীত ছবি) গত বছরের ৩ মে থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর জেরে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের নিরাময় কেন্দ্রেই মাদকাসক্তদের চিকিসৎসা নেওয়ার হার দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের ভীতি ও আতঙ্ক থেকে মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় মনোযোগ দিয়েছে পরিবারগুলো। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মাদকাসক্ত ব্যক্তি আগে রাজি না হলেও অভিযান শুরুর পর নিরাময় কেন্দ্রে যান। এছাড়া জনসচেতনতা সৃষ্টিতে মাদকবিরোধী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচারণাও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তারা।
তবে মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাময়কেন্দ্র নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্র থেকে মোট ২৫ হাজার ৩৫৫ জন চিকিৎসা নেন। ২০১৮ সালে র্যা ব ও পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৩৫ জনে। এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি নিরাময় কেন্দ্রে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ হাজার ১৪৩ জন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সরকারি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেন ৯ হাজার ৪৪৭ জন মাদকাসক্ত। একই বছর বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নেন ৬ হাজার ৯১২ জন। ২০১৬ সালে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেন ১২ হাজার ৮১৫ জন। বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩৯৭।
২০১৭ সালে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেন যথাক্রমে ১৪ হাজার ৬৮৮ জন এবং ১০ হাজার ৬৬৭ জন। তবে ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর তা অনেকটাই বাড়ে। ওই বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খায় নিরাময়কেন্দ্রগুলো। ২০১৮ সালে কেবল সরকারি নিরাময়কেন্দ্র থেকে ২৪ হাজার ১৪৩ জন মাদকাসক্ত চিকিৎসা নেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অপরদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যাও বাড়ে। ওই বছর বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্র থেকে ১২ হাজার ৮৯২ জন চিকিৎসা নেন। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৭ হাজার ৪১৮ জন। এর মধ্যে সরকারি নিরাময়কেন্দ্র থেকে ১৭ হাজার ১১ জন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ৪০৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
মাদকসেবীদের চিকিৎসার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চারটি নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় তাদের সবচেয়ে বড় নিরাময়কেন্দ্র। এটির বেড সংখ্যা ১২২টি। এর মধ্যে পুরুষের জন্য ১০০টি বেড, বাকি ২২টি নারীদের। এছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট একটি করে নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি নিরাময়কেন্দ্র থেকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে পারেন ১৯৭ জন।
অপরদিকে, দেশের ৪১টি জেলায় ৩১৯টি বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে। এসব বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে বেড রয়েছে মোট ৪ হাজার ৩৫টি। ২৩ জেলায় কোনও নিরাময়কেন্দ্র নেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। মাদকাসক্ততা একধরনের অসুস্থতা, এর জন্য চিকিৎসা নিতেই হবে। চিকিৎসা নিলে মাদক সেবন থেকে বের হওয়া যায়।’ মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়ার কারণেই এই সংখ্যা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে মাদকবিরোধী অভিযান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ সমানভাবে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করছে। তাই মানুষের মধ্যে একধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ মাদক থেকে তার প্রিয়জনকে রক্ষা করতে চাইছে, তাই চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা দ্রুত মাদকমুক্ত হবো।’
রাজধানীর বারিধারার ‘জে’ ব্লকে ৪০ শয্যার প্রমিস মেডিক্যাল লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি মাদক নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে। এর চেয়ারম্যান শাহেদুল ইসলাম হেলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছে। অনেকে ফোনেও খোঁজ নিচ্ছে। কেউ কেউ ভর্তি করছেন। একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মানুষের মনে একটি ভয়ও কাজ করেছে। এজন্যও অনেকে মাদক থেকে দূরে আসতে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়েছে। সমাজে একটা পরিবর্তন আসছে।’ তবে আরও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে বলে মত দেন তিনি।
র‌্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৩ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হানিনার নির্দেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে র্যা ব। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ৩ মে থেকে এ বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতার করা হয় ৩১ হাজার ২৪৬ জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীকে।
র‌্যাবের হিসাব অনুযায়ী এসময় তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ১২৮ জন। এরা সবাই মাদকব্যবসায়ী বলে দাবি র‌্যাবের। আর পুলিশ বলছে, গত বছরের ৩ মে থেকে গত ১৫ মে পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ১৬৯ জন।
তবে বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণা সেলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছেরের ৩ মে থেকে এ বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ৪৯৬ মাদক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ২৮৬ জন, র‌্যাবের সঙ্গে ১৪১ জন, বিজিবি’র সঙ্গে ৪১ জন, গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ২৩ জন এবং অজ্ঞাতদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিহত হন ৫ জন।
র‌্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. ক. সারোয়ার বিন কাশেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে চলমান আমাদের মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে মানুষ বেশি সচেতন হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সবাই অবস্থান নিয়েছে। বর্তমানে নাগরিকরা তাদের সন্তানদের বিষয়েও সচেতন হয়েছে। কারণ, আমাদের মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন, বিজ্ঞাপন সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। মানুষ মাদকের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরেছে।’ এ কারণে মাদকের এই অসুস্থতা থেকে সুস্থ হতে চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম