মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই নব্য জেএমবি সদস্যরা গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, ‘নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা কোনও অনুকম্পা পেতে পারে না।’ বুধবার (২৭ নভেম্বর) রায়ের পর্যবেক্ষণে এ মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান।
রায় পড়ার সময় বিচারক বলেন, ‘‘হলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারী ছিল তামিম চৌধুরী। আসামি আসলাম হোসেন র্যাশ তার দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে, ‘আমি তখন তামিম ভাইয়ের কাছে গুলশান বা কোনও কূটনৈতিক এলাকায় আক্রমণের উদ্দেশ্য জানতে চাই। তামিম ভাই বলে, আমাদের সংগঠন নব্য জেএমবি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত। আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করা প্রয়োজন।’ কাজেই এটি প্রতিষ্ঠিত যে তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে হলি আর্টিজানে হামলা চালানো হয়। বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করাসহ জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই তামিম চৌধুরীর পরিকল্পনায় নব্য জেএমবি সদস্যরা হামলা করে ১৭ জন বিদেশি, চার জন বাংলাদেশি নাগরিক ও দুই জন পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে। এছাড়া অনেককে গুরুতর আহত ও জিম্মি করে।’’
হামলার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্রহরণের চেষ্টা করা হয়েছে
মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘কলঙ্কজনক এ হামলার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্রহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এ ঘটনায় শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়। এজন্য সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আসামিরা কোনও ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। এক্ষেত্রে আসামিদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর ৬(২)(অ) ধারার প্রদত্ত সর্বোচ্চ সাজা দেওয়াতেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। এতে ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনেরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।’
ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, ‘নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষ যখন রাতের খাবার খেতে হলি আর্টিজান বেকারিতে যায়, তখনই আকস্মিকভাবে তাদের ওপর নেমে আসে জঙ্গিদের হামলা। জঙ্গিরা শিশুদের সামনে এই হত্যকাণ্ড চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য জঙ্গিরা নিথর দেহগুলোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। মুহূর্তের মধ্যে হলি আর্টিজান বেকারি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।’
আদালতের নিরাপত্তায় ছিল র্যাব-পুলিশের সহস্রাধিক সদস্য
মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা সিএমএম কোর্ট এলাকায় ভোর থেকে অবস্থান ন্যায় সহস্রাধিক পুলিশ ও র্যাব সদস্য। আদালতের প্রতিটি প্রবেশপথে সবাইকে তল্লাশি করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
আসামিদের আদালতে আনা হয় কড়া নিরাপত্তায়
কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে বুধবার (২৭ নভেম্বর) সকাল সোয়া ১০টার দিকে বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে আসামিদের আদালতে আনা হয়। তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পথে তাদের প্রিজন ভ্যানের সামনে ও পেছনে র্যাব ও পুলিশের ছিল কড়া পাহারা।
হাজতখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক মইনুল ইসলাম আদালতে তাদের গ্রহণ করেন। প্রিজনভ্যান থেকে আসামিরা পুলিশ ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে হেঁটে হাজতখানায় প্রবেশ করে। এ সময় তাদের শান্ত দেখা যায়। এ সময় শরিফুল ইসলাম খালিদ, আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে র্যাশ তাদের এক আঙুল উঁচিয়ে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে। তবে, পুলিশ সদস্যরা তাদের দুই হাত ধরে থাকার কারণে সেই ভঙ্গি পুরো বোঝা যায়নি। তাদের একে একে সবাইকে হাজতখানায় রাখা হয়।
আদালত কক্ষে প্রবেশে দুই দফায় আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পঞ্চম তলার পশ্চিম পাশের শেষ মাথায় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কক্ষ। ভবনটির নিচতলার সিঁড়িতেই আর্চওয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে সবাইকে তল্লাশি করে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ। ট্রাইব্যুনালে প্রবেশের আগে ফের পুলিশের আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়। সেখানে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের একজন করে তল্লাশি করা হয়। পরিচয়পত্র যাচাই করে ১১টা ৪০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। তবে, এজলাসে বিচারক আসার আগে সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ট্রাইব্যুনাল কক্ষটি ডিভাইস দিয়ে চেক করার জন্য আইনজীবী ও সাংবাদিকদের আদালত ত্যাগ করতে বলে পুলিশ। এরপর ১১টা ৫৮ মিনিটে পুনরায় তাদের আদালতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
যে পোশাকে আসামিরা এসেছিল আদালতে
আইএসের পতাকার আদলে টুপি পরার পাশাপাশি আইএসের মতো কালো পাঞ্জাবি পরে আদালতে আসে জঙ্গিরা। দুপুর ১২টা ১ মিনিটে আট আসামিকে একে একে কাঠগড়ায় নিয়ে আসে পুলিশ। এ সময় আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যানের মাথায় ছিল কালো একটি টুপি, পরনে পাঞ্জাবি ও ট্রাউজার। আসলাম হোসেন র্যাশের পরনে ছিল প্যান্ট ও ফুলশার্ট। রাজীব গান্ধীর পরনে ছিল কালো পাঞ্জাবি। বড় মিজানের গায়ে ছিল সাদা পাঞ্জাবি। হাদিসুর রহমান সাগরের পরনে ছিল টি-শার্ট ও প্যান্ট। খালেদের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি। রিপনের পরনে ছিল পোলো-শার্ট ও প্যান্ট। সে আদালতপাড়ায় শান্ত ছিল। সোহেল মাহফুজের গায়ে ছিল সাদা পাঞ্জাবি ও মাথায় ছিল সাদা টুপি। গায়ে শীতের পোশাকও ছিল।
আইএসের টুপি পরে রিগ্যান আদালতে হাজির হয়েছিল। পুলিশ হেফাজতে থাকার পরও সে কীভাবে এ টুপি পেলো, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সমালোচনা। পুলিশ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।
১২টা ৫ মিনিটে এজলাসে ওঠেন বিচারক
দুপুর ১২টা ৫ মিনিটের দিকে আদালতের এজলাসে আসেন বিচারক মজিবুর রহমান। এরপর ট্রাইব্যুনালের কর্মচারীরা আট আসামির নাম ধরে ডেকে হাজিরা নিশ্চিত করেন। আসামিদের হাত উঁচিয়ে উপস্থিত থাকার বিষয় নিশ্চিত করতে বলেন আইনজীবীরা। এ সময় আট জঙ্গি হাত উঁচিয়ে তাদের উপস্থিতির কথা জানান।
দুপুর ১২টা ৮ মিনিটের দিকে বিচার মূল রায় পড়া শুরু করেন। রায়ে তিনি বলেন, ‘রায় প্রকাশের পর হয়তো অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানাবেন। কিন্তু আমরা ন্যায়বিচারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। অনেকে মনে করে রায় কারও পক্ষে বা বিপক্ষে যেতে পারে কিন্তু আমরা ন্যায়বিচারের জন্য চেষ্টা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আসামিদের সবার একই অভিপ্রায় ছিল। মানুষ হত্যা করে আইএসের কাছে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।’
বিচারক দুপুর ১২টা ১৬ মিনিটে রায় পড়া শেষ করে এজলাস ছেড়ে চলে যান।
রায় শুনে আসামিদের ঔদ্ধত্য আচরণ
বিচারক রায় পড়ে এজলাস ছেড়ে যাওয়ার পর ‘আল্লাহু আকবর’ বলে জঙ্গিরা একসঙ্গে স্লোগান দেয়। এ সময় একজন বলে, ‘আমরা বেহেশতে চলে যাচ্ছি।’ আরেকজন বলে, ‘তোমরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নেমে পড়ো।’
রায়ে পুলিশ ও নিহতের পরিবার খুশি
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘হলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায়ের বিষয়ে আমরা সন্তুষ্ট।’
এদিকে, সাত জনের মৃত্যুদণ্ডের ফলে বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নিহত পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস।
যে সাত জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো—হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা ওরফে র্যাশ, ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ। খালাস পেয়েছে বড় মিজান।








