ইশতেহারে নজর ছিল না আতিকুল ইসলামের

শাহেদ শফিক
০২ জানুয়ারি ২০২০, ০৯:৪২আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২০, ০৯:৪৪

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম (ফাইল ছবি)

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মো. আনিসুল হকের মৃত্যুতে উপনির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন তারই উত্তরসূরী মো. আতিকুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এক বছরের জন্য নির্বাচিত এই মেয়রের উপনির্বাচনি ইশতেহারে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থ, সচল ও একটি আধুনিক ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। বছর শেষে তিনি আবারও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু তার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলেও চলমান কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাকে। 

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডিএনসিসির মেয়র নির্বাচিত হন প্রয়াত আনিসুল হক। মাত্র আড়াই বছর দায়িত্ব পালন করার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর মারা যান তিনি।  এরপর ডিএনসিসির দায়িত্ব পালন করেন প্যানেল মেয়র ওসমান গণি। ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুর পর ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামাল মোস্তফা দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উপ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হন সদ্যপদত্যাগ করা মেয়র আতিকুল ইসলাম।

নির্বাচনের আগে আতিকুল ইসলাম ‘সবাই মিলে সবার ঢাকা: সুস্থ, সচল, আধুনিক ঢাকা’ শিরোনামে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। তিনি ইশতেহারে নির্মল ও বিশুদ্ধ বাতাস ফিরিয়ে আনা, মশামুক্ত শহর, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত পার্ক, সবুজ শহর, ভেজালমুক্ত কাঁচাবাজার, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থা, আধুনিক বাসস্টপেজ, জলাবদ্ধতা নিরসন, দুর্নীতি দমনে বিশেষ কমিটি গঠন, প্রতিটি এলাকায় সাংস্কৃতিক ও সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলা, সীমিত আয়ের নাগরিকদের জন্য সাধ্যের নাগালে আবাসন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু, গত ১০ মাসে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তেমন কোনও বিশেষ উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিশুদ্ধ বাতাস ফিরিয়ে আনা:

মেয়রের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী নির্মল বাতাস নিশ্চিতে বিশেষ কোনও উদ্যোগ ছিল না। এই সময়ের মধ্যে বায়ূ দূষণের বিশ্বের এক নম্বর শহরে পৌঁছে যায় রাজধানী ঢাকা। এরপর কয়েকটি পানি ছিটানোর গাড়ি নামান মেয়র। সর্বশেষ বায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই উদ্যাগ থমকে যায়।

মশামুক্ত শহর:

তার দায়িত্ব পালনকালে দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিরুনি অভিযানসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করেন তিনি। মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন মেয়র। মশকনিধনে বছরমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার কথা জানান মেয়র। বিদেশ থেকে মশার ওষুধ ও মশা মারার যন্ত্রপাতি আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে কোনও চেষ্টাই মশা নিয়ন্ত্রণে আসেনি। 

আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত মাঠ ও পার্ক:

প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্যতম আরও একটি ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত মাঠ ও পার্ক তৈরি করা। কিন্তু প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সময়ে শুরু করা ডিএনসিসির ২৪ মাঠ-পার্কে ইতোমধ্যে উন্নয়ন কাজ এখনও শেষ হয়নি। যে কারণে শিশুদের খেলার স্থান সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় মেয়রকে উত্তরার সাত নম্বর সেক্টরের একটি সড়কে প্রতি শুক্রবার সকালে শিশুদের জন্য খেলার ব্যবস্থা করতে দেখা গেছে। 

ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ:

এক বছরের নির্বাচনি ইশতেহারে ডিজিটাল পদ্ধতি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পথচারী পারাপারে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরীর ৪৮টি স্থানে পুশ বাটন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউয়ের গ্রিন হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনের সড়কে দুটি পুশ বাটন স্থাপন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক দিনের মধ্যেই এগুলোর অকার্যকর হয়ে গেছে।

ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থা ও আধুনিক বাস স্টপেজ:

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্ন ছিল ৬টি কোম্পানির মধ্যে নগরীর সব পরিবহন পরিচালনা করা। সেই স্বপ্ন থেকেই সরকার বাসরুট রেশনালাইজেশন কমিটি গঠন করে দেয়। ওই কমিটির সদস্য হিসেবেও রয়েছেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। তাছাড়া তার ইশতেহার অনুযায়ী নগরপরিবহন ব্যবস্থার জন্য একটি ডিজিটাল-সমন্বিত ই-টিকিটিং সেবা চালুর ঘোষণা ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে পায়নি নগরবাসী।

জলাবদ্ধতা নিরসন:

মেয়র আতিকুল ইসলামের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। তবে তার এই স্বল্প সময়ে কালশি এলাকায় বিকল্প ড্রেনের মাধ্যমে পানি অপসারণ করে ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছুটা ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া সামান্য বৃষ্টি হলেই মিরপুর ১২ নম্বর থেকে ১০ নম্বর হয়ে আগারগাঁও, ধানমন্ডি-৩২ ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও নিরসনে কোনও উদ্যোগ ছিল না।

টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা:

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক থাকাকালে ডিএনসিসিতে বেশ কয়েকটি আধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সপার স্টেশন (এসটিএস) বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঘর নির্মাণ করেছেন। মেয়র আতিকুল ইসলাম টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার সময়ে সংস্থার নতুন কোনও পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করছেন নগরবাসী। তাছাড়া পরিবেশ দূষণ করায় ডিএনসিসির আমিনবাজার ল্যান্ডফিল বন্ধের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

অন্যান্য প্রতিশ্রুতি:

ডিএনসিসির সাবেক এই মেয়রের প্রতিশ্রতিগুলোর মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি ছিল-নারীর জন্য নিরাপদ নগরী, দুর্নীতি দমনে বিশেষ কমিটি গঠন, প্রতিটি এলাকায় সাংস্কৃতিক ও সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলা, সবুজ শহর, ভেজালমুক্ত কাঁচাবাজার, সীমিত আয়ের নাগরিকদের জন্য সাধ্যের নাগালে আবাসন ব্যবস্থা। কিন্তু এসবের কিছুই দেখতে পায়নি নগরবাসী।

গত ১০ মাসে নতুন বড় কোনও প্রকল্প হাতে নেয়নি ডিএনসিসি। এই সময়ে মেয়র আনিসুল হকের সময়ে অনুমোদিত আগের প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করেছেন তিনি। আর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। ডিএনসিসিতে এখনও সড়কে এলইডিবাতি, ডিজিটাল বিলবোর্ড, যাতায়াত অনুপযোগী সড়ক, নতুন যুক্ত হওয়া নতুন ওয়ার্ডগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তবে আতিকুল ইসলাম তার স্বল্প সময়ে যে কর্মকাণ্ড দেখিয়েছেন তা কিছুটা হলেও উত্তর সিটিবাসীকে আশা দেখিয়েছে বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

নগর বিশেষজ্ঞের বক্তব্য:

জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আতিকুল ইসলামকে মূল্যায়ন করার এখনও সময় আসেনি। একজন জনপ্রতিনিধিকে তার কাজের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে ৫ বছরও যথেষ্ট নয়। তবে তিনি তার এ স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেননি। যে কারণে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আতিকুল ইসলাম যে সময় পেয়েছেন সেটি অবশ্যই যথেষ্ট নয়। তবে তিনি এক বছরের জন্য যে ইশতেহার দিয়েছেন সেটির কয়েকটি বাস্তবায়ন করতে পারলেও নাগরিকদের আশা আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন হতো। তবে তিনি তার কর্মকাণ্ডে কিছুটা আশা জুগিয়েছেন।

যা বললেন আতিকুল ইসলাম:

জানতে চাইলে আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা চেষ্টার কোনও কমতি ছিল না। অনেকগুলো ঘটনা আমাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর মধ্যেও কালশিতে বড় দুর্ভোগ ছিল। সেটা চার মাসের মধ্যে সমাধান করেছি। সুযোগ পেলে বাকিকাজগুলোও শেষ করবো।

 

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম