নওগাঁর রাণীনগর-আবাদপুকুর-কালীগঞ্জ সড়কের উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গেল বছরের শুরুতে টেন্ডারের মাধ্যমে রাস্তা প্রশস্তকরণ ও সংস্কার কাজ শুরু হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, গাফিলতি আর অবহেলার কারণে বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে। ২২ কিলোমিটার সড়কের ৭ কিলোমিটারে বালি ও ইটের খোয়া ফেলা হলেও তাতেও অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর কাজ বন্ধ থাকায় বেহাল সড়কে যাতায়াত করে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাণীনগর থেকে কালীগঞ্জ পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার। একনেকে এ সড়কটি প্রশস্তকরণ ও সংস্কারের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২২ কিলোমিটার সড়ক ও ২৩টি কালভার্টের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৪ কোটি টাকা আর তিনটি সেতুর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪১ কোটি টাকা। এ বছরের এপ্রিলে সড়কটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
গত বছরের শুরুর দিকে দরপত্রের মাধ্যমে সড়কটির তিনটি সেতু, ২৩টি কালভার্ট নির্মাণ ও সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। শুরুর দিকে কাজে গতি থাকলেও বর্তমানে সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে। এরমধ্যে তিনটি সেতুর একটিরও অবকাঠামো ও পার্শ্ব সড়কের কাজ শেষ হয়নি। অপরদিকে ২৩টি কালভার্টের মধ্যে ৮-১০টির কাজ কোনোমতে শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন ও স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি সড়কটির প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন ছাড়াও কালভার্ট ও সেতু নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, মোট ২২ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে খাঁনপুকুর থেকে কালীগঞ্জ পর্যন্ত মাত্র ৭ কিলোমিটারে ইট ও বালি বিছানো হয়েছে। এই ৭ কিলোমিটারের কোথাও কোথাও পুরনো পাথরই দেওয়া হয়েছে। পুরো সড়কটি ১৮ ফুট চওড়া করার কথা থাকলেও তা হয়নি। অপরদিকে হাতে গোনা কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও বাকিগুলো নির্মাণের কোনও প্রস্তুতি নেই।
করজগ্রামের বাসিন্দা সুরুজ মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন সড়কটির কোনও সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে তা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পুরো সড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। ওই সড়কে চলাচল করা যানবাহন প্রায়ই যন্ত্রপাতি ভেঙে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। কোনও রোগী এ সড়কে চলাচল করলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
কালিকগ্রামের বাসিন্দা সুলতান বলেন, আমরা ভেবেছিলাম নতুন বছর ও মুজিব শতবর্ষে উপজেলার পূর্বাঞ্চলটি উন্নয়নের নতুন মহাসড়কে যোগ দেবে। কিন্তু সড়কের কাজের যে অবস্থা তাতে আরও বেশ কিছুদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি একদিন কাজ করলে তিন মাস বন্ধ রাখে। আমরা জানি না কোন কারণে এই সড়কটির কাজে এমন ধীরগতি। এছাড়াও জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধানের হাট-আবাদপুকুরে চলাচল করার জন্য এটিই একমাত্র প্রধান সড়ক হওয়ায় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের লোক পড়েছে চরম বিপদে।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র ও প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবীর বিভিন্ন অনিয়ম ও গাফিলতির কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে সড়কের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল, তা সঠিক। তবে পুনরায় কাজ শুরু করা হয়েছে। কাজের সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা হয়েছে। আমরা অল্প অল্প করে কাজ করছি। কারণ পুরো সড়কটির কাজ একই সময়ে শুরু হলে দুর্ভোগ বাড়বে। এখন পর্যন্ত যেটুকু কাজ হয়েছে তাতে কোনও অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সড়কটির উন্নয়নকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কথা বলেছেন নওগাঁ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হামিদুল হক। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন সড়কের অবস্থা খারাপ হয়ে আছে। সেতু ও কালভার্টের কাজের অগ্রগতি ভালো হলেও সড়ক সংস্কার কাজে ঠিকাদারের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে অগ্রগতি নেই। এ কারণে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে কাজটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হবে না। তবে নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সড়কের উন্নয়নে বেশি সময় লাগায় স্থানীয়দের সমালোচনার মুখে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম। তিনি বলেন, কিছু কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদারের জন্য সরকারের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ পিছিয়ে পড়ছে। সড়কের বেহাল অবস্থা ও উন্নয়নে বেশি সময় লাগায় স্থানীয়দের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আর এ জন্য জনগণ আমাকে ও আমার পরিবারকে গালমন্দ করছে। সড়কটির কাজ দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থাও করছেন বলে জানান তিনি।








