সহসা কমছে না শিশুদের স্কুলব্যাগের ওজন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কারিকুলাম পরিবর্তন করে বইয়ের সংখ্যা কমানোর উদ্যোগের কথা বললেও বিশ্লেষকরা বলছেন, কনটেন্ট-এর পরিসর নিয়ে না ভেবে কেবল বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে ভার কমানো সম্ভব না। আর শিশুদের ভিন্নরকমভাবে পাঠদান আন্দোলনে যারা যুক্ত তারা বলছেন, শিশুর বোঝা কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও। সেই বোঝা কমাবেন কী করে? তারা এও বলছেন, শিশু যেন তার নিজের ব্যাগ নিজে বহন করতে পারে সে অনুযায়ী ওজন নির্ধারণ করতে হবে। শিশুকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্যও সেটা জরুরি।
২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহন নিষেধ করে সুনির্দিষ্ট একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেন। রায় পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে এই আইন করতে আইন সচিব, শিক্ষা সচিব, গণশিক্ষা সচিবসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দুই বছরেও আইন না হওয়া এবং নির্দেশনা না মানায় সংশ্লিষ্টরা একটি আদালত অবমাননা আবেদনও করেছিলেন। সেটি এখনও শুনানির অপেক্ষায় আছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৬ মাসের মধ্যে আইন করার কথা বলা হলেও বছরের পর বছর সেটি না হতে দেখে আমরা আদালত অবমাননার আবেদন করেছিলাম। এখনও সেটি শুনানির অপেক্ষায় আছে। এই বিষয়টি সমাধান না করতে পারার গ্লানি থেকে তিনি বলেন, আমার সন্তান আমাকে একই প্রশ্ন করে, ‘বোঝা কমানোয় আমি কিছু করতে পারলাম না কেন?’
বইয়ের বোঝা যেন শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের বেশি না হয় সেটিকে ধরে আইন করতে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি নিজেও বিষয়টি নিয়ে সংবেদনশীল। কেন আমাদের শিশুরা বোঝা বহন করবে। কিন্তু একইসঙ্গে উচ্চ আদালত বলেছিলেন সার্কুলার জারি করে বিষয়টি বাস্তবায়ন করার বিষয়ে, এবং সেটি করা হয়েছে, কাজও হচ্ছে। এরপরও এখন আইনটি দরকার আছে কিনা সেটির বিভিন্ন দিক দিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
বর্তমানে এনসিটিবির পাঠক্রম অনুযায়ী প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তিনটি করে পাঠ্যবই এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয়টি করে পাঠ্যবই পড়তে হয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ১৩টি পাঠ্যবই পড়তে হয়। নবম-দশম শ্রেণিতে ২৭টি এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩৯টি পাঠ্যবই আছে। তবে, বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ আলাদা আলাদা থাকায় নবম-দশম ও একাদশ শ্রেণিতে সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ের বই পড়তে হয় না।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগামী বছর শিশুরা পরিমার্জিত বই পাবে। আমরা প্রাথমিকের শিশুদের বইও কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। কয়েকটি বিষয় আছে যেগুলোর পৃথক বই না হয়ে একসঙ্গে করা যায়, সেসব নিয়ে কাজ হচ্ছে।
সহজ পাঠের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সচিব সিদ্দিক বেলাল মনে করেন, শারীরিক বোঝার চেয়ে শিশুর মনের বোঝা আরও বেশি। বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে, কনটেন্ট ঠিক না করে আসল চাপ কমবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকে যদি ৫০টা বইয়ের লিস্ট দেই, সেসব বই শিশুর জন্য সম্পদ, চাপ নয়। তার নিজের বইয়ের কালেকশন হবে। সেগুলো বাইরের বই। ছোট থেকেই শিশুরা মনের আনন্দে বই পড়তে শেখে, যারা পড়তে পারে না তাদের অভিভাবকরা পড়ে শোনান, বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের স্কুলে ক্লাসের বই যা থাকবে তার সব শিশুকে বহন করতে হয় না, ভালো ফলাফলের চাপে তাকে ক্লাসের বাইরে কোচিং-টিউশনি নিতে হয় না, এরকম শিক্ষা ব্যবস্থাই শিশুর ওপর চাপ কমাবে।
শিশুদের জন্য অন্য জগৎ তৈরির উদ্যোগ নিয়ে শৈশব নামে একটি কাজে হাত দিয়েছেন শিক্ষা গবেষক ফারহানা মান্নান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশুকে নিজের ব্যাগ নিজেই বহন করতে দেওয়া উচিত। ব্যাগ এতো ভারী কেন হবে যে শিশু বহন করতে পারে না। প্রতিদিন ক্লাসরুমে সব বই নেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই। রিডিং পড়ার দরকার হলে বই অবশ্যই লাগবে। কিন্তু প্রবলেম প্র্যাকটিস করার জন্য বইয়ের দরকার নেই। শিক্ষক বোর্ডে লিখে দিতে পারেন। ব্যাগের ওজন কমানোর জন্য বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়ে দেওয়াটা কোনও কাজের কথা না। বরং একটা যৌক্তিক পরিকল্পনা দরকার। যাতে করে শিশুরা কেবল পাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বই স্কুলে নেয়।
সর্বশেষ গতবছর ২১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও শিশুদের পরীক্ষার ভার কমাতে বলেছেন। বাচ্চাদের পরীক্ষা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে উল্লেখ করে বইয়ের ভার থেকে বাচ্চাদের মুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি। তবে এর কার্যকরী ফল এখনও পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নতুন কোনও উদ্যোগ নেয়নি।








