দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত চলাকালেই গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন মো. আশরাফুল আলম। গত ৩১ ডিসেম্বর এ পদে নিয়োগ পান তিনি। এর আগে রংপুর গণপূর্ত জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প (১৩৩ কোটি টাকার) বাস্তবায়নে ১৩ ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনেও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে আশরাফুল ও তার সহযোগীদের দুর্নীতির তথ্য উল্লেখ আছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আশরাফুল ও তার পরিবারের সদস্যদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে গত বছরের (২০১৯) আগস্টে। আশরাফুল ও তার স্ত্রীর কাছে সম্পদের বিবরণী চেয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
একনেক ও আইএমইডির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি আশরাফুল আলম। তবে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে কেউ অভিযোগ দিলেই দুদক চিঠি পাঠায়। অনুসন্ধানের পর বোঝা যাবে তারা কী চায়, আর কী পেয়েছে।’
নিজেকে সৎ দাবি করে আশরাফুল আলম। বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।’
বিসিএস ১৫তম ব্যাচের প্রকৌশলী আশরাফুল আলম ১৯৯৫ সালে গণপূর্ত অধিদফতরে সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে উপ-বিভাগীয় প্রকৌলী, ২০০৭ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী, ২০১৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ২০১৮ সালে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১, মেডিক্যাল কলেজ ডিভিশন, গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল এবং রংপুর গণপূর্ত জোনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনের সময় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, আশরাফুলের গ্রামের বাড়ি বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার দিগদাইর গ্রামে। তার ঢাকার ঠিকানা হলো—ফ্ল্যাট নম্বর-৫/এ, বাড়ি নম্বর-২১, রোড নম্বর-৪৯, গুলশান-২।
চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণে দুর্নীতি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশন। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঘুষের বিনিময়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণের কাজ পাইয়ে দেন আশরাফুল। অভিযোগ আছে, মানহীন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প এটি।
২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি চূড়ান্ত করে। ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনকে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনের অধীনে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী নির্মাতা হিসেবে চুক্তিপত্রে দেখানো হয়। ওই চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেসার্স রফিক ট্রেডার্সকে চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, মেসার্স জ্যাকো কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স ইন্সটেন্সকে স্টাফদের আবাসিক ভবন নির্মাণ ও মেসার্স খলিলুর রহমানকে নার্সদের ডরমেটরি নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগ, কায়কোবাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে যৌথভাবে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণ করা করা হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি প্রতিনিধি দল ২০১২ সালের ১২ জুন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন। তারা ১০ তলা হাসপাতালের মূল ভবন, চিকিৎসকদের ৬ তলা আবাসিক ভবন, স্টাফদের আবাসিক ভবন ও নার্সদের ডরমেটরি নির্মাণকাজে ত্রুটি দেখতে পান। পরে এ নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় একনেকে। এতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে একনেক। ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট এই কমিটি গঠন হয়। কমিটি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায় এবং এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। তদন্তে ১৩ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে প্রকৌশলী আশরাফুলসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর ওই প্রতিবেদন গণপূর্তের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হলেও সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
আশরাফুল ও তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান
গত বছরের আগস্টে আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী সাবিনা আলমের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এই অনুসন্ধান করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মেফতাহুল জান্নাত। তখন জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পায় দুদক।
আজ (বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারি) আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী সাবিনার কাছে সম্পদের হিসাববিবরণী চেয়ে পৃথক দুটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ২১ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পদবিবরণী দাখিলের এই নোটিশ পাঠান দুদকের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম। নোটিশে আশরাফুল ও তার স্ত্রীকে নিজেদের এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়দেনা, আয়ের উৎস ও তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ নির্ধারিত ফরমে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আশরাফুলের বিরুদ্ধে দুদকে যত অভিযোগ
১. কথিত যুবলীগ নেতা ও বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীম সিন্ডিকেটের ১৫ ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসূত্র আছে আশরাফুল আলমের। ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিটি প্রকল্প থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন পান তিনি।
২. গণপূর্ত অধিদফতরের শেরেবাংলা নগর ডিভিশন-১ এ একসময় নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন আশরাফুল আলম। সেখানে দায়িত্ব পালনের সময় ২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিমাসে ৩ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে ৩০০ জনকে ভাউচারভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেন।
৩. ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।








