২০১৯ সাল ছিল আক্ষরিক অর্থেই ডেঙ্গুর বছর।দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগের এমন প্রাদুর্ভাব দেশের ইতিহাসে আর কখনও হয়নি। আর এর শুরুটা হয়েছিল বছরের মাঝামাঝি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শুরুতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের কথা অস্বীকার করলেও সমালোচনার মুখে তা স্বীকার করে নেন। এরপর মশা মারতে সব আয়োজন সম্পন্ন করে দুই সিটি করপোরেশন। পুরনো ওষুধে কাজ না হওয়ায় বিদেশ থেকে বিমানে উড়িয়ে আনা হয় মশা মারার নতুন ওষুধ। পাশাপাশি এ সেক্টরে যুক্ত করা হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি। বাড়ানো হয় বরাদ্দও। কিন্তু মশা কমেনি,উল্টো আরও বাড়ছে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন মশা নিধনে মূল কাজের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে লোক দেখানো কর্মসূচিতে ব্যস্ত। তাছাড়া কাজের ফল আসছে কিনা সে বিষয়েও কোনও তদারকি নেই। ফলে চলতি বছর এ রোগের ভয়াবহতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
গত বছরের ১৭ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতর দুই সিটি করপোরেশনে এডিসসহ অন্যান্য মশা নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। এক হাজার বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তাতে ৫০০ বাড়িতে গড়ে ২০৭টি এডিস মশা পাওয়া যায়। ওই বছরের ৩ থেকে ১১ মার্চ ওইসব বাড়িতে পরিচালিত আরেকটি জরিপে এডিস মশা পাওয়া গিয়েছিল গড়ে ৩৬টি স্থানে। জরিপে এডিসের লার্ভা বেড়েছে বলেও তথ্য উঠে এসেছে। এই জরিপে দক্ষিণ সিটির প্রতি বাড়িতে গড়ে মশার উপস্থিতি ২৬ আর উত্তর সিটিতে ২১টি।
এই জরিপ পরিচালনার পর গত বছরের জুনের শুরু থেকে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরপর শুরু হয় সিটি করপোরেশনের নানা উদ্যোগ। আটঘাঁট বেঁধে মাঠে নামে সরকারের অন্য সব সংস্থাও। কিন্তু কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। মার্চের জরিপের চার মাসের মাথায় দক্ষিণ সিটির প্রতি বাড়িতে গড়ে মশার উপস্থিতি ৭৯টি এবং আর উত্তরে ৫৭টি। এই অবস্থায় দীর্ঘ ৬ মাস নগরবাসীকে ভুগিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কর্মকাণ্ডে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমেছে বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা।
উত্তর সিটির কর্মকাণ্ড:
দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পর বেশ কিছু উদ্যোগ নেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে- এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি (৫ বছর) পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য ‘ইন্ট্রিগেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় ডেঙ্গু নিয়ে মতবিনিময়, সভা সমাবেশ, পোস্টার-র্যালিসহ প্রচারণামূলক নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ‘চিরুনি অভিযান’, ‘৬ দিনে এক ওয়ার্ড’ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালিত হয়।
ডিএনসিসি সূত্র জানিয়েছে, প্রচারণার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতেও কাজ করেছে সংস্থাটি। এ খাতে বরাদ্দও বাড়িয়ে করা হয়েছে দ্বিগুণ। মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করার জন্য ২০০টি সুইং ফগ মেশিন, ২৩৮টি পালস্ ফগ মেশিন,১৫০টি হার্টসন হস্তচালিত মেশিন, ৩৪০টি প্লাস্টিকের হস্তচালিত মেশিন, ২টি ভেহিক্যাল মাউটেন্ট ফগার মেশিন, ১০টি মোটর সাইকেলে ফগার ও হস্তচালিত মেশিন সংযোজন এবং ২০টি মিস্ট ব্লোয়ার বা পাওয়ার স্প্রে মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ভেহিকেল মাউটেন্ট ফগার মেশিন ক্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএনসিসির।
এদিকে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করতে ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে জরিপ কাজও পরিচালনা করেছে ডিএনসিসি। এ জন্য দুই জন কনসালটেন্ট ও ১০ জন শিক্ষানবিশ কীটতত্ত্ববিদের নেতৃত্বে ওয়ার্ডভিত্তিক ১৫ দিনব্যাপী জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। গত ৭ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত জরিপকারীরা ৬৩৫টি স্থানে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে ডিএনসিসিকে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে এসব স্থানের ২১৫টিতে অতি উচ্চমাত্রায়, ১৭৫টি স্থানে উচ্চমাত্রায়, ১৬৭টিতে মাঝারি ও ৭৮টিতে কম মাত্রায় মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরপর জরিপ অনুযায়ী স্থানগুলোতে ফগিং করা হয়। এসব কাজের পাশাপাশি আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০ জন করে মশক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরেও মশার উৎপাত কমছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর।
দক্ষিণ সিটির কর্মকাণ্ড:
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর বিশেষ ক্যাশ প্রোগ্রাম, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। মশার লার্ভা নিধনে মাসব্যাপী বাসাবাড়ি পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। করা হয়েছে জেল জরিমানাও। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ থেকে নতুন ওষুধ আমদানির পাশাপাশি অ্যারোসল ক্যান বিতরণ করা হয়। মশন নিধনবহরে যুক্ত করা হয় অত্যাধুনিক যান-যন্ত্রপাতি।
এর বাইরেও ৫ বছর মেয়াদি মহা-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা আওতায় সিঙ্গাপুরের আদলে ‘কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট’ নামে একটি আলাদা বিভাগ খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য সরকারের উচ্চমহলে একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উড়ন্ত মশা নিধনে নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে।
গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার পর দুই সিটিতে ব্যবহৃত মশার ওষুধের গুণগত মান নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠে। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে নতুন ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের পুরো ওষুধ পরিবর্তন করেও উত্তর সিটি করপোরেশন এখনও পুরানো ওষুধ ব্যবহার করছে। তবে সংস্থাটি কিছু পরিমাণে নতুন ওষুধও আমদানি করেছে।
যা বলছেন বাসিন্দারা:
বারিধারার বাসিন্দা মাহমুদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাসায় দিনে তিনবার নিজস্ব ফগিং দিয়ে স্প্রে করি। কিন্তু এরপরেও মশার অত্যাচারে থাকা যায় না। দিনরাত একাধিক কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। বারিধারা, গুলশান ও বনানীতে যদি এই দশা হয় তাহলে অন্য এলাকার অবস্থা কী তা ভাবা উচিত।
বাসাবোর বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ডেঙ্গু মৌসুমে মশা মারতে এতো আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু কোনও কাজ তো দেখছি না। মশা তো কমছে না। সিটি করপোরেশনের উচিত হবে কেন মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না সে বিষয়ে ভালো করে গবেষণা করা।
বিশেষজ্ঞ বক্তব্য:
জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ডিএনসিসির মশা বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিটি করপোরেশনের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা যে পরিকল্পনা দিয়েছি সেটা যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে হয়তো কিছু পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও বলেন, এখন সিটি করপোরেশন যেসব কাজ করছে এবং যেসব যান-যন্ত্রপাতি যুক্ত করেছে সেগুলো দিয়ে সঠিকভাবে কাজ হচ্ছে কিনা কিংবা কাজের ফলাফল আসছে কিনা সেটা দেখা জন্য থার্ড পার্টি দিয়ে মনিটরিং করতে হবে। সেই দল সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রধানকে একটি গোপন প্রতিবেদন দেবে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী সংস্থা ব্যবস্থা নেবো। কিন্তু আমাদের সেখানেই দুর্বলতা রয়েছে। এই কাজটি হচ্ছে না বলেই সফলতা আসছে না।
কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা মনে করাটা ভুল হবে যে,গত বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি ছিল। এবছর কমে যাবে। আমাদেরকে সারা বছর কাজ করতে হবে। এখন থেকে প্রস্তুত হতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোকে মশা নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে।’
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য:
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে ডিএনসিসির রিসোর্স বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সার্বক্ষণিক কীটতত্ত্ববিদদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কিউলেক্স মশা নির্মূলে গবেষণা করে সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র (হটস্পট) চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে। ডেঙ্গুর কারণে যাতে আর কোনও প্রাণহানি না ঘটে সেজন্য ডিএনসিসি সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ডিএনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথেষ্ট প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করে বলেছেন, ‘জনগণ এখন জানে কেন ডেঙ্গু হয় এবং কীভাবে প্রতিরোধ করতে হয়। এরপরও যদি কেউ সচেতন না হন তাহলে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানা করা হবে।’
ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। ৫ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমরা লার্ভিসাইডিং ধ্বংসে বেশি জোর দিচ্ছি। আমাদের নাগরিকরাও অনেক সচেতন হয়েছেন।








