পুরান ঢাকায় প্রাণ ফিরে পেলো বাহাদুর শাহ পার্ক (ভিডিও)

শাহেদ শফিক
১০ মার্চ ২০২০, ২২:৫৭আপডেট : ১১ মার্চ ২০২০, ১৮:৩৭

ভারতীয় উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনামলের স্মৃতিবিজড়িত বাহাদুর শাহ পার্ক গৌরব বহন করে আসছে। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পার্কটি সাজানো হয়েছে নতুন আঙ্গিকে। সংস্কারের মাধ্যমে এর আধুনিকায়ন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই পার্কে বজায় রাখা হয়েছে পুরনো ঐতিহ্য। নতুন নকশায় সাজানো হলেও পুরনো কোনও কিছু বদলানো হয়নি। ৮৫ কাঠারও বেশি আয়তন জুড়ে পার্কটির ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত পটভূমি ছিল নকশার মূল ভাবনায়।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সরেজমিন দেখা গেছে, পার্কের শতভাগ সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। খুলে গেছে চারদিকের অস্থায়ী ঘেরাও। এদিন চলছিল ধোয়ামোছার কাজ। ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বুধবার (১১ মার্চ) এটি উদ্বোধন করবেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ছিল। এতে মানুষের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা খুব একটা ছিল না। পার্কটির উন্নয়ন হওয়ায় ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষা পেয়েছে। একইভাবে মানুষ এটি সঠিকভাবে ব্যবহারের অধিকার ফিরে পেয়েছে বলে আমি মনে করি।’

ইতোমধ্যে মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পার্কের পরিবেশ। কেউ বিস্তৃত ওয়াকওয়েতে হাঁটছেন, কেউবা নতুন বানানো বেঞ্চে বসে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠেছেন গল্প-আড্ডায়। আশেপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পার্কে বসে বই পড়তে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ঐতিহাসিক এই স্থান।

বাহাদুর শাহ পার্ক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের অগ্রাধিকার পাওয়া ‘জল সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় বাহাদুর শাহ পার্ক সংস্কার করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। জিট ইন্টারন্যাশনাল ও প্রোমা ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করেছে।
নতুনভাবে নকশা তৈরিসহ প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশিষ্ট স্থপতি রফিক আজম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণত পুরনো বা ঐতিহ্যবাহী জিনিস বিনষ্ট করে নতুন কিছু গড়ারে প্রবণতা দেখা যায়। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে পার্কটির আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আগের সবকিছু ঠিক রেখেই নতুন নকশায় সাজানো হয়েছে জায়গাটি। শুধু পার্কের চারপাশের সীমানাপ্রাচীর অপসারণ করা হয়েছে। ফলে যেকোনও দিক দিয়ে পার্কে প্রবেশ করা যাবে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্য রক্ষার সঙ্গে আধুনিকতা এসেছে। আমরা বাহাদুর শাহ পার্কের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েই এর উন্নয়ন করেছি।’

বাহাদুর শাহ পার্কের ফটক হাঁটার পথ
ঐতিহ্যবাহী পার্কটির চারদিকে ১২ ফুট চওড়া হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় থাকবে ব্যায়ামের সরঞ্জাম। ফলে প্রাতঃভ্রমণসহ শরীরচর্চা করতে পারবেন আগ্রহীরা। হাঁটার পথ ঘেঁষেই বেড়ে উঠবে ছোট ছোট ঝোপঝাড়। একইসঙ্গে থাকবে নানান ফুলের গাছ। বেঞ্চ তো আছেই। ফলে হাঁটাহাঁটির পর চাইলে বসে বিশ্রাম নেওয়া যাবে।

৪ ফুট গভীর ড্রেন
একসময় সামান্য বৃষ্টি হলেই পার্কটিতে পানি জমে যেতো। সংস্কারের ফলে এমন চিত্র দেখা যাবে না। বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হাঁটার পথের নিচে খনন করা হয়েছে চার ফুট গভীর ড্রেন। এর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে অতিরিক্ত পানি ভিন্ন ড্রেনের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হবে। একইভাবে ড্রেন থেকে পার্কে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

বাহাদুর শাহ পার্কের সিপাহী বিদ্রোহ স্মৃতিস্তম্ভ সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিস্তম্ভ
বাহাদুর শাহ পার্কে রয়েছে দুটি স্মৃতিস্তম্ভ। এর একটি ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহকে মনে করিয়ে দেয়। অন্যটি ঢাকার নবাব আহসানউল্লার বড় ছেলে খাজা হাফিজুল্লার স্মৃতিস্তম্ভ। সংস্কারের সময় কোনও পরিবর্তন না এনে এগুলো পরিষ্কার করে রঙ দেওয়ার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বাতি। সিপাহী বিদ্রোহ স্মৃতিস্তম্ভের মেঝের পুরনো পাথর সরিয়ে ডিএসসিসি বসিয়েছে ভালো মানের পাথর। পাশাপাশি এতে দেওয়া হয়েছে শ্বেতশুভ্র রঙ। রাতের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ দুটির চারদিকে আছে আলোক ব্যবস্থা।

বাহাদুর শাহ পার্কের সিপাহী বিদ্রোহ স্মৃতিস্তম্ভ অ্যাম্ফিথিয়েটার
সিপাহী বিদ্রোহ স্মৃতিস্তম্ভের মাঝের অংশ অনেকটা মঞ্চের মতো। এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা যাবে। এসব আয়োজন উপভোগের জন্য মঞ্চের উল্টো পাশে থাকবে একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার।

বাহাদুর শাহ পার্কের রাতের চিত্র ঝলমলে আলোক ব্যবস্থা
পার্কের দুটি স্মৃতিস্তম্ভ আগে অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকতো। সংস্কারের ফলে এতে যুক্ত হয়েছে আলোক ব্যবস্থা। এর মধ্যে আছে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন বেশকিছু বাতি। এগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হবে স্মৃতিস্তম্ভটি আলো দিয়েই গড়া! পার্কের বাকি অংশে সাধারণ লাল রঙের আলো থাকছে। মাঠজুড়ে আলো ছড়ানো হবে আনুভূমিকভাবে। গাছগুলোতে মৃদু আলোকসজ্জার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রাতে এই অংশ বেশ আলোকিত থাকবে।

বাহাদুর শাহ পার্কের রাতের চিত্র পার্কে নুড়িপাথর
ওয়াকওয়ে ছাড়া পার্কের সবখানেই কংক্রিট এড়িয়ে নতুন নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। একইসঙ্গে এখানকার একটি গাছও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে সজাগ ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিটি গাছ আছে আগের মতো। পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে বেশকিছু গাছের চারা। ফলে পার্ক জুড়ে থাকছে বৃক্ষছায়া।

নতুন নকশা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলীরা জানান, কোনও জায়গায় ছায়া থাকলে ঘাস জন্মায় না। এ কারণে পার্কের মাঝপথে বৃষ্টির সময় কাদা জমে যায়। তাই এক ফুট পুরু করে ছোট ছোট নুড়িপাথর দিয়ে জায়গাটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এর সুবাদে বৃষ্টির পানি পাথরের নিচ দিয়ে চলে যাবে নির্দিষ্ট ড্রেনে। আর ওপর দিয়ে অনায়াসে হাঁটা-চলা করা যাবে।

বাহাদুর শাহ পার্ক ট্রাফিক সমস্যা নিরসন
পার্কের চারপাশে একটি বৃত্তাকার লুপ দিয়ে সদরঘাটমুখী যানবাহনগুলো ইউ-টার্ন নেয়। অনেক সময় পার্কের গা ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বাস। নতুন নকশার ফলে সেই সুযোগ থাকছে না। পার্কের দক্ষিণ দিকে বাস রাখার জন্য জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। আর উত্তর দিকে দুই লেনের রাস্তাটিকে এক লেন করে দিয়েছে ডিএসসিসি। একটু চওড়া করা হয়েছে অন্য লেনটি।

অন্যদিকে বাহাদুর শাহ পার্ক ও পাশের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার রাস্তার মাঝের সড়ক বিভাজক টেনে পার্কের দিকে নিয়ে আসা হবে। ফলে জবি’র দেয়ালের পাশের অংশ চওড়া হবে। সেদিকে দুই লেনে বাস রাখা যাবে এবং মাঝখানে বাস চলাচল করতে পারবে। আর পার্ক লাগোয়া সড়ক বিভাজকের আগ পর্যন্ত রাস্তার অংশটি সরু থাকবে। ফলে লুপ দিয়ে ঘুরে ছোট গাড়িগুলো ওই অংশ দিয়ে বের হতে পারবে।

বাহাদুর শাহ পার্কের পাবলিক টয়লেট পাবলিক টয়লেট
পার্কে আসা দর্শনার্থীদের জন্য উত্তর-পূর্ব কোণে একটি আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। এতে প্রতিবন্ধীসহ নারী ও পুরুষের জন্য আছে বিশেষ চেম্বার।

বাহাদুর শাহ পার্কের খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতিস্তম্ভ পার্কের ইতিহাস
পুরান ঢাকার সদরঘাটের কাছে লক্ষ্মীবাজারে এই ময়দানের প্রথম নাম ছিল ‘আন্টাঘর’। ঢাকার আর্মেনীয়দের বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল এই ময়দানে। ক্লাবঘরটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। ১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণের পর এই ময়দানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’।
১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৬১) সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ময়দানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। সেই থেকে এই নামে পরিচিত জায়গাটি।
ছবি: প্রতিবেদক

/জেএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
চিনি ও ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান
চিনি ও ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান
চীনের ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল কী
চীনের ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল কী
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের বল নিলামে, ভিত্তিমূল্য ৩১ কোটি টাকা
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের বল নিলামে, ভিত্তিমূল্য ৩১ কোটি টাকা
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে কী, রাজনৈতিক প্রভাব নাকি মাদক 
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে কী, রাজনৈতিক প্রভাব নাকি মাদক 
সর্বাধিক পঠিত
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার
লক্ষ্মীপুরে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যাবিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল
বিএসএফের ২১ ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে বিজিবি 
বিএসএফের ২১ ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে বিজিবি 
নতুন নিয়মে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন কীভাবে করবেন
নতুন নিয়মে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন কীভাবে করবেন