করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এসব পণ্য পেতে সাধারণ মানুষকে নানা বিড়ম্বনা ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিতরণকৃত খাদ্যসামগ্রী সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড বা সংস্থা এলাকার ভোটার না হলে পাওয়া যাচ্ছে না। ন্যাশনাল আইডি কার্ড (এনআইডি) ব্যবহার করে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। এমন অভিযোগের সিংহভাগই দুই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে।
করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া ছিন্নমূল ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি শুরু করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। গত ২৮ মার্চ বিকালে পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কে মাসব্যাপী এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। এর পর থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তার এই কর্মসূচির আওতায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও জোন কর্মকর্তারা এসব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন।
এ ছাড়া লোকলজ্জায় যারা খাদ্যসামগ্রী নিতে প্রকাশ্যে আসতে চান না, তাদের জন্য হটলাইনও চালু করা হয়েছে। সেখানে যারা ফোন করছেন তাদের খাদ্যসামগ্রী বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) তার এলাকাধীন ৩০ হাজার ছিন্নমূল খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে মাসব্যাপী খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরইমধ্যে সংস্থাটি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু করেছে। সব মিলিয়ে সংস্থাটির আওতায় ৯৯ হাজার ৫৪টি প্যাকেট ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে যেসব খাদ্যসামগ্রী স্থানীয় কাউন্সিলরদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে তাতে ন্যাশনাল আইডি কার্ড নিয়ে বিতরণ করার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রাবাদ এলাকার বাসাবাড়িতে কাজ করেন রাজশাহী থেকে আসা মোমেনা বেগম। গত ১৩ বছর ধরে তিনি এই এলাকাতেই থাকেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে তাকে যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন বাড়ি মালিকরা। এ অবস্থায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তিনি। প্রতিদিন এলাকার রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়ান, এক প্যাকেট ত্রাণের আশায়। তবে তিনি এলাকার ভোটার না হওয়ায় ত্রাণ পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগ এই নারীর।
জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোটার কার্ড ছাড়া চাউল দেয় না। আমরা তো এই এলাকার ভোটার না। তাই কাউন্সিলর চাউল দিচ্ছে না। অন্য এলাকায় গেলেও সবাই ভোটার আইডি কার্ড চায়। বিগত সময়ে সামান্যটুকু সহায়তাও পাইনি। সবাইকে কতোভাবে বলেছি, হাতে পায়ে ধরেছি, কেউ একটু সাহায্য করেনি।’
একই অভিযোগ সালাম বেগমের। কাজের খোঁজে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসা এই নারী কাজ করেন ধানমন্ডি এলাকার বাসা বাড়িতে। তার ভাগ্যেও জোটেনি এক প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আইডি কার্ড দেখালেও ত্রাণ দেয় না, বলে আমরা নাকি ঢাকার না। ঢাকার মানুষ তো ধনী। সবাই বাড়িওয়ালা। তাহলে এই ত্রাণ কি তারা নিচ্ছে? আমাদেরকে দেয় না! রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসে থাকি। সরকারের বাইরের কেউ যদি কিছু আনে, সেগুলো পাওয়ার আশায়। কিন্তু সরকারি কোনও ত্রাণ আমরা পাই না।’
তবে এরমধ্যে কেউ কেউ ব্যতিক্রমও রয়েছেন। ঠিকানা দিলে বাসা বাড়িতে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেকের বিরুদ্ধে এই কথাটি শুনছি। তারা ন্যাশনাল আইডি কার্ড ছাড়া ত্রাণ দিতে চান না। তবে আমার এলাকায় এসব লাগে না। শুধু ঠিকানা দিলেই হয়। সেখানে ত্রাণ পৌঁছে দেই। এছাড়া আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে হটলাইনও চালু করেছি।’
এমন অভিযোগ সিটি করপোরেশনের কাছেও এসেছে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার কাছে কয়েকজন নাগরিক ফোন করে এই অভিযোগ জানানোর পর আমরা নির্দেশ দিয়েছি, খাদ্যসামগ্রী বিতরণে কোনও এনআইডির দরকার নেই। ঢাকার ভোটার হওয়াও লাগবে না। যারা গরিব, কর্মহীন, কষ্টে রয়েছেন শুধু তাদেরকেই এই খাদ্যসামগ্রী দিতে হবে। যারা আইডি দেখে খাদ্য বিতরণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেন তিনি।
অপরদিকে ডিএনসিসির ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা বলেন, ‘আমরা সব কাউন্সিলরকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে ত্রাণ বিতরণে আইডি কার্ড না চান, এর কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু এলাকার বাসিন্দা হলেই অসহায় ও দুস্থদের ত্রাণ দিতে হবে।’ কার্ড নিয়ে ত্রাণ দেওয়ার অভিযোগ আর কোনও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে আসলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।








