রাত ৯টা। মিরপুর রোডে রাপা প্লাজার কোনায় শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে বসা এক নারী। বয়স ৫৫। গাড়ি পাশে দাঁড়াতেই উঠে দাঁড়িয়ে চাল কেনার টাকা চাইলেন। এত রাতে কেন এখানে বসে আছেন জানতে চাইলে বললেন, রাতে গাড়িতে করে ত্রাণ দেয় শুনেছি। সন্ধ্যার পর এসে বসেছি। আরেকটু রাত হলে ছেলে আসবে। কোথায় থাকেন? প্রথমে দ্বিধা করলেও পরে বললেন, রায়েরবাজার বাঁধের ওখানে। বাড়িতে চাল নেই। রিকশাচালক ছেলের আয় রোজগার নেই।
১৭ এপ্রিল, রাত সাড়ে ৯টা। ষাটোর্ধ্ব এক পুরুষ বসা পরিকল্পনা কমিশনের ফুটপাতের কোনায়। চারপাশ জনমানুষশূন্য। তিনি জানালেন, এর আগে দুইদিন পেয়েছি। তিন কেজি চাল দিয়েছিল একজন, এক কেজি ডাল, এক কেজি আলু। কথায় খুব মায়া। ৫ জনের মুখ পরিবারে। তিন কেজি চালে কী হয়?
তিনি বলে যান, এক গ্যারেজে গাড়ি পাহারার কাজ করতাম। গ্যারেজ বন্ধ, গত মাসের পুরো বেতন পাইনি, মাস শেষে যেতে বলেছিল মালিক। কিন্তু গেলে জানিয়েছে পরে যোগাযোগ করতে।
এলাকায় কেউ ত্রাণ দেয় কিনা জানতে চাইলে বলেন, এলাকায় ‘ভোটার কার্ড’ চায়। আমি তো এখানকার ভোটার না, তাই আমার ত্রাণও নাই।
রাত সাড়ে আটটা, লালমাটিয়া আবাসিক এলাকা। আঁচলে মুখ ঢাকা আরেক মহিলা, আঁচলের ওপরেই একটা মাস্ক পরে হাঁটছেন আর গেটে গেটে ঘুরে খাবার খুঁজছেন। দারোয়ানদের কাছে গিয়ে বলছেন, একটু খাবার দিতে কন কেউরে, এহানে বইসাই খাই। শেষবার সকালে খাইলাম।
এগিয়ে গিয়ে বাড়ি কোথায় প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, ‘খেতে দেন।’
খাবার এগিয়ে দিলে আগ্রহ নিয়ে খেয়ে তারপর বলেন, ‘এখন আমি বোঝা। গায়ে শক্তি ছিল যখন তখন কাজ করে দুই ছেলে বড় করে তাদের বিয়ে দিছি। দুইজনে যা একটু দেখতো, এখন তো তাদেরই দেখার কেউ নাই। আমারে বাসায় নেওয়ার কেউ নাই। সারা দিন বের হয়ে একবেলা পেট ভরে কেউ খেতে দেয় কিনা সেই খোঁজ করি। রাতে বাসায় ফেরার পথে কিছু পেলে সাথে নিয়ে যাই। এমন দিন শেষ হবে কবে’—প্রশ্নটা ছুড়ে তিনি সামনে এগিয়ে যান।
কেবল রাতেই এরকম দৃশ্য চোখে পড়ছে তা নয়, ধানমন্ডি, মিরপুর রোড, রোকেয়া সরণি ঘুরে একই চিত্র নজরে আসে দিনের বেলাতেও।
এলাকার ভোটার ছাড়া ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে না–এমন অভিযোগটি নজরে আনা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী শাহ মো. এমদাদুল হকের। জবাবে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেউ যদি করে থাকে খুব খারাপ কাজ করছে। এরকম কোনও নির্দেশনা আমরা দেইনি। আমরা বলেছি, পথবাসী বস্তিবাসী প্রত্যেককে ত্রাণ পৌঁছে দিতে হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনাভাইরাসে সবাই সংক্রমিত হতে পারে, তবে বৃদ্ধদের আক্রান্ত হওয়ার ভয় বেশি। কিন্তু, খাবার খুঁজতে পথবাসী, বস্তিবাসী মানুষদের বাইরে ঘুরতে হচ্ছে। এতে তারা কেমন ঝুঁকিতে জানতে চাইলে প্রিভেনটিভ মেডিসিনের চিকিৎসক লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বয়সী মানুষ খাবার পাচ্ছেন না মানে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা জানি, প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া মানে কোভিড সংক্রমণের সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া। তারা বাইরে বেরিয়ে আসার কারণে আমরা যে সামাজিক শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলছি সেটি ব্যাহত হচ্ছে এবং ওই ব্যক্তিরা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন। কেননা, যে ধরনের সুরক্ষা পোশাক পরা দরকার সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। শরীরের ভেতর ও বাইরে থেকে সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, এতে আক্রান্তের ভয়াবহতা বাড়বে। করণীয় উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক কাউন্সিলে বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডে মেম্বার, কমিশনার যারা আছেন তারা উদ্যোগ নিয়ে হতদরিদ্রদের তালিকা করে বাসায় বাসায় খাবার পৌঁছে দিলে সমাধান সম্ভব। এটি করতে না পারলে লকডাউন বলুন বা শারীরিক সুরক্ষা বলুন, কোনোটিই কাজ করবে না। মনে রাখতে হবে, একজন করোনাভাইরাসের শিকার হওয়া মানে অনেকের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করা।








