৭ বছর আগে ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে মৃত্যু হয় ১,১৩৪ শ্রমিকের। বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এ দুর্ঘটনার পর বড় ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে দেশের প্রধান এই রফতানি খাতটিকে৷ সেসময় কারখানার অবকাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করতে এসেছিল অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। সাত বছর পরে করোনার আক্রমণে কারখানা বন্ধ হবে কিনা, হুট করে খুলবে কার সিদ্ধান্তে, পিপিই বানানোর নামে কারখানা খুলে রেখে শ্রমিকদেরকে কাজে আসতে বাধ্য করার মতো কাজগুলো সঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আদতে গুনগত কোনও পরিবর্তন এই খাতে হয়েছে কিনা?
শ্রমিক নেতারা বলছেন, মালিকরা শ্রমিককে তার অংশী মনে না করলে কখনও পরিবর্তন আসবে না। ন্যায্য মজুরি দূরে থাক, শ্রমিকদের যেকোনও বিপদে একরকম জোর করে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও হরহামেশা দেখতে পাওয়া যায়। তারা বলছেন, মালিকের মুনাফার শিকার হচ্ছেন পোশাক শ্রমিকরা। রানা প্লাজা থেকে করোনা বিপর্যয় সবখানেই শ্রমিকদের প্রতি মালিকদের আচরণ জুলুমের। আর মালিক বলছেন, এধরনের দুর্ঘটনাকে দিবসকেন্দ্রিক স্মরণ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। শ্রমিকদের জন্য দেশীয় আইনে যা যা অধিকার দেওয়ার সেটি তারা দিয়ে আসছেন।
ধসের আগে রানা প্লাজায় একটি ফাটল দেখা গিয়েছিল। মালিক সোহেল রানাকে সেটি দেখানোও হয়। কিন্তু ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল একরকম জোর করেই কাজে ঢোকানো হয় শ্রমিকদের। চাকরি বাঁচাতে কাজে যোগ দিলেও তারা জানতো না এই প্রবেশের মূল্য দিতে হবে তাদের। মুহূর্তে ধসে পড়ে পুরো ভবন, মাটির নিচে চাপা পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক।
৭ বছর পরে ২০২০ সালে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাসের আক্রমণের শিকার, পুরো বিশ্ব যখন লকডাউনে ঘরবন্দি সময় কাটাচ্ছে তখন গার্মেন্ট ছুটি দিলে হাজার হাজার শ্রমিক গ্রামে ফিরে যান। মাত্র কয়দিন পরেই তাদের নিজ নিজ কাজে যোগ দেওয়ার জন্য লোক মারফত, টেলিফোনে খবর পাঠানো হয়। করোনার ভয় কাটিয়ে, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মাইলের পর মাইল হেঁটে কাজের জায়গায় এসে শ্রমিকরা শোনেন কারখানা ফের বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এর মধ্যেই করোনার সম্ভাব্য বাহক হিসেবে তাদের সামাজিক হেনস্তার শিকার হতে হয় উল্লেখ করে পোশাক শ্রমিক নেতা নাজমা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এসব অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স দিয়ে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে না। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শ্রমিক যতক্ষণ তার নিজের কথা না বলতে পারবে ততক্ষণ কিছু বদলাবে না।
সেটা কীভাবে সম্ভব জানতে চাইলে তিনি বলেন, দায়িত্ববোধের জায়গাটা নিয়ে ভাবতে হবে। ক্ষমতা যে কেবল মালিকের বিষয় না, সেটা শ্রমিকের বিশ্বাসে আনতে হবে। ক্ষমতাও সমবণ্টনের বিষয়। শ্রমিকের কাছে ক্ষমতা নেই, কথা বলার অধিকার নেই। সরকারের আইনগুলোকে কীভাবে সক্রিয় করা যায় সেসব নিয়ে কাজ করার আছে।
রানা প্লাজা এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, এক অর্থে গণহত্যা উল্লেখ করে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের নেত্রী জলি তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মালিকের মুনাফার শিকার হয়েছে রানা প্লাজার কয়েক হাজার শ্রমিক। সেই অবস্থা তো বিন্দুমাত্র বদলায়নি। আজ এই করোনা মহামারিতেও মুনাফার জন্য বলি হচ্ছে গার্মেন্ট শ্রমিকরা। তিনি বলেন, এই দুঃসময়ে শ্রমিকদের প্রতি মালিক ও সরকারের আচরণ ইতিহাসে বড় অন্যায়-জুলুম হিসেবে চিহ্নিত হবে। দেশের মানুষ মালিক শ্রেণির এই ভূমিকা ঘৃণার চোখে দেখে। যে কারণে রানা প্লাজায় হাজার শ্রমিক প্রাণ হারায় একই কারণে আজ লাখ লাখ শ্রমিক মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়েছে। শ্রমিকের অধিকার বলে কিছু নেই। মালিকৈর ইচ্ছে অনুযায়ী শ্রমিক চলতে বাধ্য হয়।
এখনও রানা প্লাজার আহত শ্রমিকরা ও নিহত শ্রমিকের পরিবার যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়নি দাবি করে এই নেত্রী বলেন, চিকিৎসার অভাবে অসংখ্য পঙ্গু শ্রমিক দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। আমাদের দাবি পঙ্গু ও নিহত শ্রমিকের পরিবারকে সারা জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এখন পর্যন্ত বিচারের কোনও খবর নাই। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করে পরের শ্রমিক হত্যা থামাতে হবে। সেই সঙ্গে বলতে চাই, এই মহামারিতে শ্রমিকরা একদিকে তাদের মজুরি পাচ্ছে না অন্যদিকে ছাঁটাই ও লে -অফ করা চলছেই। শ্রমিকের বকেয়া মজুরি পরিশোধ, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনর্বহাল, লে-অফ প্রত্যাহার করতে হবে, সরকারকে এটা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গত ৪০ বছর ধরে একটি সেক্টরকে আমরা গড়ে তুলেছি। কিছু কারখানার কারণে পুরো সেক্টরকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলার সুযোগ নেই। তিনি দিবস স্মরণ করার বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে এধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার কয়টাকে নিয়ে এমন স্মরণ উদযাপন দেখা যায়? এই সেক্টর নিয়ে কথা বলার জন্য সংশ্লিষ্ট নন এমন অনেকে কথা বলেন বলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দেশের শ্রম আইনে শ্রমিকের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে তা আমরা দিয়ে থাকি। করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা ঢাকা ত্যাগ ও প্রবেশ নিয়ে যে সমালোচনা তার অনেকটা গণমাধ্যমের সৃষ্টি করা বলেও তিনি মন্তব্য করেন।








