দিনভর আলোচনা সমালোচনার পর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাস পদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিচালনা পর্ষদেই থাকছেন। মঙ্গলবার (৫ মে) বিদ্যানন্দের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্টে এ কথা জানানো হয়েছে।
কিশোর কুমার দাস জানান, আমার সিদ্ধান্তগুলোতে পাগলামি এবং আবেগের প্রভাব যুক্তির চেয়ে বেশি থাকে। ক্ষমা চাচ্ছি এই সীমাবদ্ধতার জন্য। আমি বিদ্যানন্দ ছাড়ছি না, পরিচালনা পর্ষদেই থাকছি। শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি। পরিচালনা পর্ষদ এখনও সে আবেদন গ্রহণ করেনি। কোনও চাপে এই সিদ্ধান্ত নেইনি। শারীরিক ক্লান্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগের কাছে হার মেনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। সব ধর্মের বিশেষ করে মুসলমানদের সহযোগিতায় এতদূর আসা। কিছু মন্দ লোক অপপ্রচার করে সেটা খুবই নগণ্য। আমার আগের বক্তব্যে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাই। অনুরোধ থাকবে আমাদের পক্ষে লিখতে গিয়ে অনুমানভিত্তিক অন্যকে দোষারোপ করবেন না।
বিদ্যানন্দের বিরুদ্ধে ‘অপপপ্রচার’ নতুন নয়
‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে এবং খাবারের সঙ্গে গো-চনা মিশিয়ে ইফতার বিতরণ করা হচ্ছে’— এমন গুজব ছড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে কয়েকটি ফেসবুক পেজ, আইডি এবং ব্লগ। এরই জের ধরে পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাস। এরপর এ নিয়ে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। এরপর মঙ্গলবার (৫ মে) বিকালে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, কিশোর কুমার দাস সপদে থাকছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালে একই অভিযোগ তুলে অপপ্রচার চালায় কিছু ফেসবুক পেজ এবং আইডি। সেখানে বলা হয় 'বিদ্যানন্দ একটি হিন্দু সংগঠন' এবং 'হিন্দু সংগঠন বিদ্যানন্দ গো-চনা মিশিয়ে ইফতার বিতরণ করছে'। সেসময় এটিকে অপপ্রচার বলে প্রতিবাদ জানান বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবকরা। প্রতিবাদে তারা বলেন—‘কয়েকটি ভুঁইফোড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ফেক ফেসবুক আইডি থেকে বিদ্যানন্দের ইফতার ও সেহরি বিতরণ কার্যক্রমকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর ও খবরের লিংক প্রকাশ করে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালাচ্ছে, যা অনেকে না বুঝে শেয়ার করছে। বিদ্যানন্দ সম্পূর্ণরূপে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেখানে সব ধর্মের শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব ধর্মের শিশুদের মানবিক ও শিক্ষা সহায়ক কল্যাণ কার্যক্রমে শ্রম দান করে। বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এই ধরনের মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
স্বেচ্ছাসেবকরা আরও জানান, ২০১৭ সালের ঘটনার পর বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বিনামূল্যে ইফতার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুকে অপপ্রচার ও মানহানির অভিযোগে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৭ সালের ১৫ জুন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম শাখার কর্মকর্তা ইয়াছিন আরাফাত বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করে পাঁচলাইশ থানার ওসিকে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ঢাকা অফিসের ইনচার্জ সালমান খান ইয়াসিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই মামলার আর কোনও আপডেট আমরা পাইনি। তেমন কোনও তদন্তের কথাও আমরা জানি না।
সোমবার (৫ মে) ফেসবুকে শ্রাবন ইস্পাহানী নামক একটি পেজ থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে বিদ্যানন্দের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে বলে দাবি করা হয়। পোস্টের শিরোনামে বলা হয়, ‘উপরে বিদ্যানন্দ, ভিতরে ইস্কানন্দ পর্ব -১’। সেই পোস্ট ভাইরাল হয়ে গেলে ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যানন্দের ভেরিফাইড পেজে পোস্ট দিয়ে লেখা হয়- ‘বিদ্যানন্দর কাজ বিদ্যা বা শিক্ষা দিয়ে শুরু হলেও বিভিন্ন সময় সংগঠনটির সঙ্গে ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা খুঁজেছেন এক শ্রেণির ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। আর এ কারণেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ থেকে কিশোর কুমার দাস সরে গেলেন।’ এছাড়া বিবিসি বাংলার লোগো ব্যবহার করে একটি ব্লগে পোস্ট করা হয়, তবে ওই লিংকের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় সেখান থেকে ব্লগ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
মঙ্গলবার অপর একটি পোস্ট দিয়ে বিদ্যানন্দ জানায়, “সংগঠনের ‘বিদ্যানন্দ’ নামটি দিয়েছেন এক মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট। ‘আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন’ স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে তিনি নামটি দিয়েছিলেন। অনেকেই এটাকে ব্যক্তির নাম থেকে ভেবে ভুল করেন। এজন্য আমরা দুই বছর আগে নাম পরিবর্তনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট করি এবং স্বেচ্ছাসেবকরা নাম পরিবর্তনের বিপক্ষে ভোট দেয়।”
এতে আরও বলা হয়, ‘৯০ শতাংশ মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরাই চালিয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির বিশাল কর্মযজ্ঞ। তবুও উদ্যোক্তার ধর্ম পরিচয়ে অনেকেই অপপ্রচার চালায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কার্যক্রম, অনুদানের গতি। গত মাসেই বিদ্যানন্দের প্রধান পদত্যাগের কথা জানিয়ে দেন স্বেচ্ছাসেবকদের। সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারে নয়, বরঞ্চ ব্যক্তিগত ত্যাগে স্বেচ্ছাসেবকদের অনুপ্রাণিত করার এবং নতুন মেধায় প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করার স্বপ্নে এমন সিদ্ধান্ত। আর তিনি প্রধানের পদ ছাড়লেও বিদ্যানন্দ ছাড়ছেন না, বরং সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে চেয়েছেন। আমরা বিষয়টি প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম চলমান ক্যাম্পেইনের পরে। কিন্তু কিছুদিন ধরে চলা মাত্রাতিরিক্ত সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারে জল ঢালতে খবরটি আজকে শেয়ার করলাম।’
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি মনিটরিং করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম। এই টিমের এডিসি নাজমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদ্যানন্দের বিষয়টি নিয়ে আমি পারসোনালি কনসার্ন, অফিসও কনসার্ন। কিন্তু এখনও কোনও আদেশ পাইনি। আমরা মনিটর করছি।








