করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া নাগরিকদের জন্য রাজধানী ঢাকায় সরকারিভাবে বরাদ্দ করা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে দুই সিটি করপোরেশন। এসবের অধিকাংশই বিতরণ হচ্ছে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে। তবে এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত খাদ্যসহায়তা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের দেওয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগের পাহাড় জমছে দুই সিটির নগর ভবনে।
সিটি করপোরেশন থেকে যেসব খাদ্যসামগ্রী বিরতণ হচ্ছে সেগুলো স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে তালিকা তৈরি করে বিতরণ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে দুই কাউন্সিলরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে তালিকা করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তার কোনও বাস্তবায়ন নেই। এর সুযোগ নিয়ে কাউন্সিলররা নিজেদের ইচ্ছেমতো তালিকা করে এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। যে কারণে তাদের পছন্দের বাইরের কেউ খাদ্যসামগ্রী পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া খাদ্যসামগ্রী পেতে হলে ঢাকার ভোটার হওয়াসহ নানা পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা আসন-১২ (৩১, ৩৩ ও ৪৩) এর কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র আলেয়া সারোয়ার ডেইজী অভিযোগ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলরদের কোনও পাত্তা দিচ্ছেন না। সরকার ও সিটি করপোরেশন থেকে কমিটি করে তালিকা প্রণয়নের নির্দেশনা থাকলেও সাধারণ আসনের কাউন্সিলররা তার তোয়াক্কা করছেন না। নিজেদের পছন্দের লোকদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। এ নিয়ে একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের কাছে অভিযোগ করেছি। কিন্তু তারাও কোনও সমাধান দিতে পারেনি। তালিকায় আমার সই লাগার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কোনও কাউন্সিলরই তা নেননি। আমার তিনটি ওয়ার্ডের কোনও ওয়ার্ডের ত্রাণ কমিটিতে আমার নাম আছে কিনা আমি জানি না। অথচ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কাউন্সিলরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি করে ত্রাণ বিতরণের জন্য।
এই নারী কাউন্সিলরের আরও অভিযোগ, ‘খাদ্যসামগ্রী পাওয়ার উপযোগী অনেকেই পাচ্ছে না। কেউ পাচ্ছে ১০ বার, আবার কেউ একবারও পাচ্ছেন না। ৬ তলা বাড়ির মালিকের নামেও রেশন কার্ড করা হয়েছে। স্বজনপ্রীতি, দলীয় ও আত্মীয়করণের কারণে এমনটা হচ্ছে। ত্রাণগ্রহীতা সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরকে ভোট দিয়েছে কিনা সেটাও বিবেচনা করা হচ্ছে। সমন্বয় কমিটি না হওয়ার কারণে দুর্নীতিগুলো হচ্ছে।’
তবে তার ওয়ার্ডের সাধারণ আসনের কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম সেন্টু তার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমরা সমন্বয় করেই ত্রাণ বিতরণ করছি। যারা পাওয়ার যোগ্য তারাই পাচ্ছেন।
নগরীর বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষের অভিযোগ বারবার ধরনা দিয়েও কোনও সহযোগিতা পাচ্ছেন না তারা। প্রতিটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে তালিকা করছেন। ঢাকার ভোটার না হলে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার ভোটারদের সিংহভাগই বিত্তশালী। তাদের অধিকাংশই বাড়ি মালিক, ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী। এরপরেও ভোটের রাজনীতির কারণে তাদেরকেই ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নামে রেশন কার্ড দেখিয়ে সেই ত্রাণ লুটপাট করা হচ্ছে।
খিলগাঁও তিলপাপাড়া প্রভাতীবাগ এলাকার বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, এক প্যাকের ত্রাণের জন্য কাউন্সিলর ও সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে বহুদিন ধরনা দিয়েছি। পাইনি। পরে কাউন্সিলরের একজন লোক আইডি কার্ড চেয়েছেন। দিয়েছি। তাও পাইনি। আমাদের মতো গরিব মানুষ যদি না পায় তাহলে সরকারের এসব সহায়তা কাদের জন্য।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, যাদের ৫ তলা বাড়ি আছে দেখি তাদের নামে ত্রাণ যাচ্ছে। আমাদের কোনও বাড়িও নেই। বস্তিতে বসবাস করি। এরপরেও একটা প্যাকেটও পাইনি। দালাল না ধরলে ত্রাণ পাওয়া যায় না। সে কারণে এখন আর ত্রাণ পাওয়ার জন্যও চেষ্টা করি না।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত আসন ১০ (সাধারণ ওয়ার্ড ২৭, ২৮ ও ৩০) এর কাউন্সিলর সামসুন নাহার ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, করোনার সঙ্গে যেমন যুদ্ধ করতে হচ্ছে ঠিক খাদ্যসামগ্রী নিয়ে সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সিটি করপোরেশন থেকে যে বরাদ্দ হয় বলা হয়েছে তার এক তৃতীয়াংশ আমরা (সংরক্ষিত কাউন্সিলর) বিতরণ করবো। কিন্তু বিতরণ করতে গিয়ে দেখি ৮ ভাগের একভাগও নেই। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো বিতরণ করছে। তাদের ওপর আমাদের নির্ভর করে চলতে হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটির সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খাদ্যসামগী বিতরণে সব কাউন্সিলরকে সমন্বয় করে বিতরণ করতে বলা হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, তালিকা প্রণয়নে কোনও আইডি কার্ডের প্রয়োজন নেই।
অপরদিকে উত্তর সিটির ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা বলেন, খাদ্যসাগ্রী বিতরণ বড় একটি বিষয়। আমরা চেষ্টা করছি যাতে কোথাও কোনও অনিয়ম না হয়। যারা প্রকৃত পাওয়ার যোগ্য তারা যেন পান। কেউ যদি ত্রাণ না পেয়ে থাকেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।








