দেশের মোট শিশুর ২০ ভাগের ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলেও শতভাগ মানুষের জন্য ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। প্রকল্পে সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ বলছে, এতে কারও শরীরের ক্ষতি হবে না। যদিও পুষ্টিবিদদের কেউ-কেউ ষোলো আনা সন্দেহ পোষণ করছেন এখনও। তাদের মতে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সমপরিমাণ তেল খাবেন না। ফলে টার্গেট গ্রুপের লাভ না হলেও যারা বেশি পরিমাণে তেলের খাবার খান, তাদের শারীরিক ক্ষতি হবেই।
রবিবার (১০ ডিসেম্বর) সুপারস্টোরগুলোয় গিয়ে দেখা গেছে, ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত তেল ছাড়া অন্য তেল নেই। তবে, পাড়া-মহল্লার দোকানে কিছু আগের তেল পাওয়া যাচ্ছে। দোকানিরা বলছেন, কোনও কোনও কোম্পানি অনেক আগে থেকেই ভিটামিন এ যুক্ত তেল বাজারে এনেছে। এবার এটা পুরোপুরি হবে বলে তাদের ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সব ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করার কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে। এর আগে, গত ১০ ডিসেম্বর ‘ফর্টিফিকেশন অব এডিবল অয়েল ইন বাংলাদেশ (ফেজ-২)’ শীর্ষক প্রকল্প আয়োজিত এক কর্মশলায় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ সময়সীমার পর বিষয়টি নিশ্চিতে অভিযান চালানো হবে। সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে কেউই বিষয়টি নিয়ে আর কথা বলছেন না। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এখনই এর ক্ষতির দিকটা ধরা না গেলেও নেতিবাচক প্রভাব মানব শরীরে ধীরে ধীরে পড়তে বাধ্য। আর আমাদের মধ্যে যে সন্দেহগুলো রয়েছে, সেগুলো কাটাতে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে কতটুকু ঘাটতি পূরণ সম্ভব হয়েছে, সে চিত্রও তুলে ধরা দরকার।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টার্গেট গ্রুপ ছাড়া সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ (যার রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার ভিটামিন-এ আছে) এ জাতীয় ভোজ্যতেলের মাধ্যমে 'হাইপারভিটামিনোসিস'-এ আক্রান্ত হতে পারেন। যার ফলে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিও হতে পারে। ২০ শতাংশ শিশুর যে ভিটামিন এ ঘাটতি রয়েছে, সেটা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দিয়ে ধীরে-ধীরে পূরণ সম্ভব। এমনকি এ প্রকল্পের ওপর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত এবং ভিটামিন ‘এ’ ছাড়া দু'ধরনের ভোজ্যতেলই থাকা উচিত।
যদিও ইউনিসেফ বলছে, ভোজ্যতেলে যে পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করা হয়েছে, তাতে ভোক্তার ২০ শতাংশ ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। বাকি ৮০ শতাংশ তারা অন্যান্য খাবার থেকে পেতেই পারেন। ইউনিসেফের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. আইরিন আখতার চৌধুরী বলেন, ‘যাদের ঘাটতি নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই ভোজ্যতেল ক্ষতির কারণ হবে না। কারণ এই তেলে খুবই সামান্য পরিমাণ ভিটামিন-এ মেশানো হবে। এর পক্ষে আমরা বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়েছি। যেখানে স্পষ্ট বলা আছে, ভোজ্যতেলে যে মাত্রার ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন করা হবে তা 'ওভারডোজিং'-এর ঝুঁকি তৈরি করবে না।’
তারপরও কেন একটা পক্ষ মনে করছেন, সবার চাহিদা সমান না হওয়ায় ভিটামিন ‘এ’ বাধ্যতামূলক করা অযৌক্তিক—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এক কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ করা হচ্ছে। আমরা বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিয়েছি, এখানে ইউনিসেফের একটি বিশেষজ্ঞ দলও কাজ করছে। এমনকি যারা শুরুতে আপত্তি জানাচ্ছিলেন, তারাও পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বুঝতে পেরে অনাপত্তির বিষয়টি আমাদের অবহিত করেছেন।
কেন দুধরনের তেলই রাখার পক্ষে কথা বলছেন না, যার যেটা দরকার সে সেটা গ্রহণ করবে সেই সুযোগ থাকা দরকার কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে আইরিন বলেন, এখন সেই সুযোগ নেই। আমাদের শিশুদের কুড়ি শতাংশ এখনও ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে রয়েছে। তাদের শরীরের সক্ষমতা না থাকায় ক্যাপসুল কনজিউম সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, এখন এই তেলের মাধ্যমে সারাদিনের যে খাবার, সেটার মধ্য দিয়ে ভিটামিন এ শরীরে দিতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ বেশি হলে যেসব সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো সামলাতে তারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, জানতে চাইলে আইরিন বলেন, বেশি হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মাত্রা ঠিক করেই এটা প্রয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিম্নবিত্তের শিশুকে এক চামচ তেল সরাসরি খাওয়ালেও তার শরীরের চাহিদা পূরণ কেবল তেল দিয়ে হবে না। সেহেতু ভয়ের কিছু নেই।
যদিও পুষ্টিবিদ সামসুন্নাহার বলেন, আমাদের ধনী ও গরিব দুই শ্রেণির মানুষ ভিন্ন জীবনযাপন করে। একজন মানুষের দৈনিক যে পরিমান ভিটামিন এ প্রয়োজন, সেটা যদি এমনিতেই পূরণ হয়, তাহলে তেলের ভিটামিন ‘এ’ তার শরীরে বাড়তি চাপ ফেলবে। তিনি বলেন, গরিব মানুষ তেলের কতটুকু খাবার খাওয়ার সামর্থ্য রাখে? টার্গেট গ্রুপ যারা তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে এটা নিশ্চিত না। বরং যারা অলরেডি চাহিদা পূরণে সক্ষম, তাদেরই বাড়তি ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ করার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বাজারে দুই ধরনের তেল রেখে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত তেলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ক্যাম্পেইন করা গেলে বিষয়টার সমাধান সহজে করা যেত বলে মত দেন তিনি।
/এমএনএইচ/
আপ-টিএন








