সড়ক-মহাসড়কের পাশে লাগানো বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন একদিকে যেমন পরিবেশ নষ্ট করছে, অন্যদিকে তেমনি দুর্ঘটনারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত এসব রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিলবোর্ড-ব্যানারে ঢেকে যাচ্ছে গাছপালাসহ সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ। ইতোমধ্যে ঝড়-তুফানে বিলবোর্ড ভেঙে দুর্ঘটনাও ঘটিয়েছে। দায়িত্বশীদলদের বারবার হুমকিতেও বিলবোর্ড-ব্যানার সরছে না। বরং বিভিন্ন দিবস এলে ব্যানার-ফেস্টুন লাগানোর হিড়িক পড়ে যায়।
অবৈধ বিলবোর্ড ও ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণের জন্য বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন তিন দিন সময় দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের। মেয়রের নির্দেশ অনুযায়ী দৃষ্টিকটু বিলবোর্ড ও ব্যানার ফেস্টুন অপসারণের কাজ চলছে।
অন্যদিকে, একই দিন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নারায়ণগঞ্জ গিয়ে সেখানকার বিলবোর্ড ও ব্যানার ফেস্টুন অপসারণের সময় বেঁধে দিয়েছেন দশ দিন। কিন্তু গত তিন দিনের মহাসড়কের কোথাও বিলবোর্ড কিংবা ব্যানার ফেস্টুন খুলতে দেখা যায়নি।
জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় বর্তমানে দু’সহস্রাধিক বড় আকারের বিলবোর্ড রয়েছে। মতিঝিল, গুলিস্তান, পুরানা পল্টন, শাহবাগ, নিউমার্কেট, ধানমণ্ডি, মিরপুর রোড, মানিকমিয়া অ্যাভিনিউ, মতিঝিল, মালিবাগ, বাড্ডা, প্রগতি সরণী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা প্রভৃতি এলাকায় বিলবোর্ড স্থাপন করে রমরমা বাণিজ্য চলছে। রাজনৈতিক কতিপয় নেতা বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে অন্যের বোর্ড দখল করে নিজেদের ছবিসহ প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে নগরীর সৌন্দর্যহানি হলেও তারা থোরাই কেয়ার করছেন।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেখানে-সেখানে লাগানো বিলবোর্ড ও ব্যানার-ফেস্টুন নগরীর সৌন্দর্যহানি করছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনাও ঘটাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। দ্রুত এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তিনি বলেন, বিলবোর্ড স্থাপন সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করা হলে নগরীর এ অবস্থা হতো না।
জানা গেছে, গত মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হক ও ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণের নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রভাবশালী বিলবোর্ড মালিকরা মেয়রদের এ নির্দেশনা গ্রাহ্য করেননি। ফলে দুই মেয়রই নিজ-নিজ সংস্থার মাধ্যমে বিলবোর্ড সরানোর উদ্যোগ নেন।
জানা গেছে, বিলবোর্ড নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে ওঠায় মেয়র সাঈদ খোকন এবার উদ্যোগী হয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি পুরান ঢাকার সুরিটোলা এলাকায় নিজের ও তার প্রয়াত বাবা মেয়র মোহাম্মদ হানিফের নামে টাঙ্গানো কিছু রাজনৈতিক বিলবোর্ড অপরসারণ করেন। এ সময় তিনি বাকি বিলবোর্ডগুলেও অপসারণ করতে সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। এই অপসারণ কাজে কেউ বাধার সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন।
শুক্রবার মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন করতে যা-যা করার দরকার, আমি তার সবই করব। এ জন্য কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই সব ব্যানার ফেস্টুন অপসারণ সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
শনিবার দেখা গেছে, ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ করা হলেও বাণিজ্যিক বিলবোর্ডগুলোর দিকে তেমন নজর দেওয়া হচ্ছে না। এ ব্যাপারে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আপাতত আমরা ব্যানার ফেস্টুনের ওপর জোর দিয়েছি। তবে কয়েকটি অবৈধ বিলবোর্ডও অপসারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, অবৈধ বিলবোর্ডের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এগুলোও অপসারণ করা হবে। তিনি বলেন, তিন দিনে প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নগরীর বাইরে মহাসড়কের পাশেও রয়েছে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি। কে কার চাইতে বড় বিলবোর্ড স্থাপন করবেন এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্যের বিলবোর্ড দখল, যেখানে-সেখানে ব্যানার-ফেস্টুন লাগানোর হিড়িক পড়ে গেছে।
দৃষ্টিকটু এ দৃশ্য দেখে বৃহস্পতিবার সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নারায়ণগঞ্জের চরসৈয়দপুর এলাকায় প্রস্তাবিত তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর স্থান পরিদর্শন শেষে বলেন, পৌর নির্বাচনকে সামনে রেখে মহাসড়কের পাশে লাগানো বিলবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন আগামী ১০ দিনের মধ্যে অপসারণ করতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে মহাসড়কে যেসব বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন সাঁটানো হয়েছে, সেগুলো আগামী ১০ দিনের মধ্যে সরিয়ে ফেলুন। তা না হলে আমরাই সরিয়ে ফেলব।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক, গাবতলী থেকে সাভার হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, উত্তরার আবদুল্লাহপুর থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কে বড় ধরণের বাণিজ্যিক বিলবোর্ড রয়েছে শত শত। রাজনৈতিক নেতারাও নিজেদের প্রচারণার জন্য অন্যের বিলবোর্ড দখল, ব্যানার স্থাপন করেছেন। পথচারী ও যানবাহনের জন্য এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তার তোয়াক্কা করছেন না কেউ।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মন্ত্রীর নির্দেশের পর মহাসড়ক থেকে বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপসারণ না হলে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের কর্মীদের দিয়ে সেগুলো অপসারণ করা হবে।
/এমএনএইচ/








