আ.লীগ এবার শাসাচ্ছে এমপিদের!

পাভেল হায়দার চৌধুরী
২২ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:৪৬আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৫, ০৮:২৩

8006 বিদ্রোহী প্রার্থী নয়, এবার কেন্দ্র থেকে শাসানো হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপিদের। পৌর নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীকে আস্কারা ও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করার অভিযোগে তাদের শাসানো হচ্ছে। এ তালিকায় রয়েছেন অন্তত দেড় ডজন এমপি। আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান এ পর্যন্ত ১৫/২০ জনের মতো এমপির নাম পাওয়া গেছে যাদের মধ্যে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থীকে পেছন থেকে আস্কারা দিচ্ছেন, আবার কেউ দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন না। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, বিভিন্ন পৌরসভা থেকে অভিযোগ এসেছে কিছু এমপি দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন না। আবার এমন অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু এমপি বিদ্রোহীদের আস্কারা দিচ্ছেন। আমরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি।
পৌর নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের পর থেকেই ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতারা প্রতিদিনই নির্বাচনি কলাকৌশল নিয়ে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে যেসব পৌরসভায় বিদ্রোহীরা এমপি কিংবা দলের প্রভাবশালীদের পরোক্ষ সমর্থন পাচ্ছেন সেগুলো আলোচনায় এসেছে। এছাড়া দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করার অভিযোগও আলোচনায় উঠে এসেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌরসভার দলের মনোনীতি প্রার্থীরাও এসব অভিযোগ কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্র থেকে অভিযুক্ত এমপিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে এসব থেকে বিরত থাকতে এমপিদের শাসানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দলীয় প্রার্থীদের পরিবর্তে বিদ্রোহীদের পক্ষে কাজ করছেন এমন পৌরসভার মধ্যে রয়েছে- গাজীপুরের শ্রীপুর, বরগুনা সদর, নীলফামারীর জলঢাকা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নড়াইলের কালিয়া, মেহেরপুরের গাংনী, ময়মনসিংহের গৌরিপুর ও ত্রিশাল, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, সুনামগঞ্জের ছাতক, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, রাউজান ও সাতকানিয়া। যেসব পৌরসভায় স্থানীয় এমপিরা দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন না সেসব পৌরসভার মধ্যে রয়েছে নাটোরের লালপুর, সিলেটের মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গোরীপুর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, শেরপুর, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, রাজবাড়ীর পাংশাসহ আরও কয়েকটি।

নীতিনির্ধারণী নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, যেসব এমপিদের পৌর নির্বাচনে বিদ্রোহীদের আস্কারা দেওয়া দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে সেসব এমপিরা হলেন- নড়াইল সদরের এমপি কবিরুল হক মুক্তি, বরগুনা সদরের ধীরেন্দ্র দেবণাথ শম্ভু, শেরপুরের আতিকুর রহমান আতিক, গাইবান্ধা-৪ এর আবুল কালাম আজাদ, গাইবান্ধা-১ এর মঞ্জুরুল আলম লিটন, সুনামগঞ্জ-৫ এর মুহিবুর রহমান মানিক, মোলভীবাজার-৪ এর উপাধক্ষ্য আব্দুস শহীদ, নীলফামারী-৩ এর গোলাম মোস্তফা, চট্টগ্রাম-৪ এর দিদারুল আলম, চট্টগ্রাম-৬ এর ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৫ এর আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন চৌধুরী নদভী, চুয়াডাঙ্গা-২ এর আলী আজগর টগর, চাঁদপুর-৪ এর শামসুল হক ভুঁইয়া, ময়মসিংহ-১৩ এর ক্যাপ্টেন (অব.) মুজিবুর ও নাটোর-১এর মো. আবুল কালাম, সুনামগঞ্জ এমপি ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী ডা. আব্দুল মান্নান ও রাজবাড়ীর জিল্লুল হাকিম, সিরাজগঞ্জের হাসিবুর রহমান স্বপন।

জানা গেছে, এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন এমপিকে কেন্দ্র থেকে ফোন করে সতর্ক করা হয়েছে। জবাবে এমপিরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কেন্দ্রীয় ৪ জন নেতার তথ্য মতে, ওবায়দুল কাদের গত কয়েকদিন ধরে বৈঠক করে এবং ফোন করে বিদ্রোহীদের নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে যাদের অনুরোধ করেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- নড়াইলে সাংসদ কবিরুল হক মুক্তি, মেহেরপুরের এম এ খালেক, চট্টগ্রামের এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, সিরাজগঞ্জে হাসিবুর রহমান স্বপন ও রাজবাড়ীর জিল্লুল হাকিম ।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সাংসদ হাসিবুর রহমানের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন পৌর সভাপতি আবদুর রহিম। কিন্তু দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় হালিমুল হককে। স্বাভাবিকভাবেই সাংসদ বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রতি সহানুভূতিশীল। গত রবিবার রাতে হাসিবুর রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের ধানমণ্ডি কার্যালয়ে বৈঠক করেন ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সেখানেই তাকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বাত্মক অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ করেন।

জানতে চাইলে হাসিবুর রহমান বলেন, তার পছন্দের চেয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত বড়। আর বিদ্রোহী প্রার্থী বহিষ্কার হয়ে গেছেন। এখন সবাই নৌকার পক্ষে মাঠে নেমেছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে বাধা হতে পারবে না।

জানতে চাইলে এবি এম ফজলে করিম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেন্দ্র থেকে নানা কারণে নেতারা ফোন করেন। তবে আমার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উত্থাপন করে কেন্দ্রীয় নেতারা আমাকে কিছু বলেননি।

এ প্রসঙ্গে কবিরুল ইসলাম মুক্তি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছি। আমরা যেহেতু এমপি নির্বাচনি বিধি-বিধান থাকার কারণে প্রকাশ্যে কাজ করতে পারছি না।

সীতাকুন্ডের এমপি দিদারুল আলম বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছি। তিনি এও বলেন, নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত আছি, কথা বলার সময় নাই।

এছাড়া চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বসে গেছেন। কিন্তু এই পৌরসভা নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনা হচ্ছে-স্থানীয় সাংসদ শামসুল হক ভূঁইয়ার অনুসারীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নামছে না। নাটোরের গোপালপুরেও স্থানীয় সাংসদ আবুল কালাম তৃণমূলের মাধ্যমে ফিরোজ আহমেদ নামে একজনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু দলের মনোনয়ন পান রুখসানা মোর্তজা। ফিরোজ বিদ্রোহী হয়ে পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। কিন্তু সাংসদ ও দলীয় প্রার্থীর মধ্যে দূরত্ব রয়ে গেছে। দুই পক্ষই গতকাল মারামারিতে লিপ্ত হয়।

একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, এসব পৌরসভার বাইরেও কিছু মন্ত্রী-সাংসদ নিজ নিজ এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছেন। কিন্তু সম্পর্ক, প্রভাব ও দলীয় অবস্থানের কথা বিবেচনা করে অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই তাদের ঘাটাতে চান না। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রভাব নেই এবং চাপ দিয়ে ভাগে আনা যাবে এমন সাংসদদের বেছে বেছে বিদ্রোহীদের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, গত এক সপ্তাহে সারাদেশে পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডজন খানেক মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এর সবগুলোই আওয়ামী লীগের মনোনীত ও বিদ্রোহীর মধ্যে ঘটেছে। বতর্মান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটা অস্বাভাবিক। মূলত সাংসদসহ দলীয় নেতারা পেছনে না থাকলে এটা হতো না।

নড়াইলের কালিয়া পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী সাকুল্যে চারজন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগেরই পাঁচজন। দলের মনোনীত প্রার্থী ওয়াহিদুজ্জামান। আর বিদ্রোহীদের মধ্যে বতর্মান মেয়র এমদাদুল হক ও দলের নেতা মুশফিকুর রহমানের তৎপরতা বেশি। স্থানীয় সাংসদ কবিরুল হকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ আছে।

একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, সাত বিভাগে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য মন্ত্রী-সাংসদ নন এমন কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে সাতটি দল গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক নেতা বিভিন্ন পৌরসভায় চলে গেছেন। তাদেরকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি বিদ্রোহীদের নিষ্ক্রিয় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ৭৬টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের ৮৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এরমধ্যে ৫৯ জন দলীয় পদে রয়েছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত এরা না বসলেও কেন্দ্রীয় তৎপরতায় কয়েকজন পরে বসেছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে সবাইকে বহিষ্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। দলের পদে আছে এমন ৫৯ জনকে স্থায়ীভাবে কেন বহিষ্কার করা হবে না তা জানাতে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে।

/এএইচ/

/আপ:আরএ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম