করোনাভাইরাস অর্থনীতিকে ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেওয়ার কারণে দেশের বিরাট একটি জনগোষ্ঠী হঠাৎ করে হয়ে পড়েছে কর্মহীন, বিশেষত দরিদ্র এবং ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো। বিআইজিডি ও পিপিআরসি’র যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রভাব এতদিনেও খুব কম মানুষই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। লকডাউন তুলে নেওয়ার ফলে অনেকে কাজে ফিরলেও ১৭ শতাংশ পরিবারের এখনও পর্যন্ত কোনও আয়মূলক কাজ নেই।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং বিআই জিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন এ তথ্য তুলে ধরেন।
পিপিআরসি বলছে, গবেষণাটিতে গ্রাম ও শহরের বস্তি এলাকার হাজার হাজার পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। প্রথমে এপ্রিল মাসে এবং দ্বিতীয়বার জুন মাসে এই জরিপ চালা হয়। জরিপে দেখা যায়— ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। যে কোনও পেশার ক্ষেত্রে করোনায় নারীদের ওপর পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যেমন জুন মাসেও অর্ধেকেরও বেশি নারী গৃহকর্মী কোনও কাজ খুঁজে পাননি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা মহামারি শুরুর হওয়ার একমাস পর এপ্রিল মাসে গ্রামে ৫০ শতাংশ এবং বস্তি এলাকার মাত্র ৩২ শতাংশ পরিবার কোনোরকম আয়মূলক কাজে জড়িত ছিল। লকডাউন তুলে দেওয়ার পর অনেকেই কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। তাই জুন মাসে এর হার যথাক্রমে ৮৩ শতাংশ ও ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে অনেকেই কাজ ফিরে পেলেও তাদের আয় তেমন একটা বাড়েনি। মহামারির শুরুতে তাদের মাথাপিছু গড় আয় অনেক নেমে এসেছিল, জুন মাসে সেখান থেকে তাদের আয় সামান্যই বেড়েছে— যা এখনও প্রাক-মহামারি পর্যায়ের অনেক নিচে। এখনও ১৭ শতাংশ পরিবারের কোনও আয়মূলক কাজ নেই।
গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইমরান মতিন বলেন, ‘‘করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এপ্রিল মাসের জরিপে আমরা দেখেছিলাম, ভালনারেবল নন-পুওর বা প্রায় দরিদ্র, যাদের মাথাপিছু আয় প্রাক-করোনাকালীন সময়ে দারিদ্র্যসীমার ওপরে কিন্তু মিডিয়াম আয়ের নিচে ছিল। তাদের মধ্যে ৭৩ শতাংশের আয় দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে চলে এসেছিল। আমরা তাদের বলছিলাম বাংলাদেশের ‘নব্য-দরিদ্র’। জুন মাসেও এই ‘নব্য-দরিদ্রদের’ প্রায় সবার আয় ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই নব্য-দরিদ্রদের হিসাবে ধরলে, বর্তমানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যর হার হয় ৪২ শতাংশ। শহরের বস্তি এলাকায় করোনার অর্থনৈতিক প্রভাব হয়েছে আরও মারাত্মক। শহরে খাবারের বাইরেও অন্যান্য বাধা খরচ, যেমন- বাড়িভাড়া,বিভিন্ন বিল,যতায়াত খরচ অনেক বেশি। এসব খরচ মেটাতে না পেরে শহরের দরিদ্ররা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। যেমন- ঢাকার ১৬ শতাংশ ও চট্টগ্রামের ৮ শতাংশ বস্তি এলাকার মানুষ অন্য জেলায় চলে গেছে। এই গবেষণা থেকে এটা পরিষ্কার, এই মহামারি আমাদের দেশে দারিদ্র্যর বিস্তার ও প্রকৃতি দুটোই পাল্টে দিচ্ছে। ’’
বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, ‘আমরা আমাদের গবেষণা থেকে কর্মহীনতার অন্যতম যে ফলাফল পেয়েছি, তা হলো ফেমিনাইজেশন। নারীপ্রধান কর্মক্ষেত্র যেমন- গৃহকর্মী খাত, সেখানে নারীরা কর্মহীনতার শিকার হয়েছেন ব্যাপকভাবে। শুধু তাই নয় আমরা দেখেছি, যেখানে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন, সেখানেও এই সময়ে নারীদের অবস্থা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় বেশি খারাপ।’
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘লোকজন কাজ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তার জন্য তাকে একটা পরিবেশ পেতে হবে, যেখানে সে সাহস পাবে। আত্মবিশ্বাস তৈরির জন্য নতুন ন্যাশনাল মুড প্রয়োজন।’








