শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পাঁচ তলায় পোস্ট অপারেটিভ রুম, ড্রেসিং রুম। নারায়নগঞ্জে ফতুল্লার তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে ঘটনায় দগ্ধদের কাউকে কাউকে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ড্রেসিং করার জন্য এখানে নেওয়া হয়। আর তাদের স্বজনরা কেউ মেঝেতে বসে, কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন ড্রেসিং শেষ করে রোগীকে বেডে নিয়ে যাওয়ার সময় একনজর দেখার জন্য। হতাহতদের স্বজনদের সঙ্গেই সেখানেই কথা হয়।
মেঝেতে বসে অপেক্ষা করছিলেন ইমরান হোসেন। নারায়নগঞ্জে পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ইমরানের বড় ভাই কেন্নান হোসেন বাপ্পী আহত হয়েছেন, আইসিইউতে ছিলেন। ৩০ শতাংশ বার্ন, কেন্নান হোসেন বাপ্পীর শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। এ ব্যাপারে ইমরান বলেন, '১১ থেকে ১২ বছর ধরে এই এলাকাতে বাস করছিল বাপ্পীর পরিবার, পোশাক কারখানায় কাজ করতেন দুভাই। কিন্তু করোনা শুরু হলে ভাই বাবা-মাকে নিয়ে তারা চলে যান গ্রামের বাড়িতে। ভাই সেদিন নামাজ পড়তে যায় মসজিদে, নামাজ শেষে বের হচ্ছিলো সে, তার নাকি এক পা ছিল বাইরে এবং আরেক পা ছিল ভেতরে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, পুড়ে যায় সে।'
ইমরান হোসেন আরও বলেন, 'ভাই আমাকে দেখেই বলেন- আমার শরীর জ্বলতেছে, আমি বাঁচমু না। পুরা শরীর তার পোড়া, চেনা যাইতেছিল না। তারপর তারে নিয়ে যাই নারায়নগঞ্জের হাসপাতালে, সেখান থেকে বলা হয় এখানে আনতে। তারপর এখানে নিয়া আসি।'
গ্রাম থেকে সম্প্রতি ভাইয়ের ঢাকার ফেরার কথা উল্লেখ করে ইমরান বলেন, 'করোনা শুরু হলে বাবা-মা আর দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে পটুয়াখালীতে গ্রামের বাড়ি চলে যান বাপ্পী। সাত দিন আগে দেশ থেকে আসছে, দেশে তো কাজ নাই, খাওয়া নাই। এতগুলা মানুষ না খাইয়া কতদিন থাকবে। তাই কাজের জন্য ঢাকায় আসে, কিন্তু যে কারখানায় কাজ করতো সেটা বন্ধ থাকায় অন্য কাজ খুঁজতেছিল।'
এরপর খেদ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, 'করোনা থেকে বাঁচার জন্য ভাই সবাইরে নিয়া গ্রামে গেলো, মাত্র সাত দিন আগে ঢাকায় আসলো, এই আগুনেই ভাইরে টাইনা ঢাকায় আনছে…।'
পাঁচ তলায় ওয়েটিং রুমে স্বজনদের ভিড়। সেখানেই কথা হয় সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, তার দেবর ১৮ বছরের সিফাতের ২২ শতাংশ পুড়ে গেছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য টাকার দরকার ছিল, আর সে টাকার জন্যেই পোশাক কারখানায় কাজ নেয় সিফাত।
শ্বশুর শাশুড়ি, দুই দেবর, স্বামী আর দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে সংসার তার। সিফাতের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে সুরাইয়া বলেন, 'নামাজ পড়ে সেদিন মাত্রই মসজিদের বাইরে বের হন সিফাত। আর তখনই মসজিদের ভেতরে আগুন লাগে, সিফাত দৌড়াইয়া ভেতরে যায় মাইনষেরে বাঁচাইতে, টাইনা টাইনা বাইর করছে, তারপর তার এই অবস্থা হইছে।'
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজের সময় বিস্ফোরণ ঘটে। ফরজ নামাজের মোনাজাত শেষে অনেকে সুন্নত ও অন্য নামাজ পড়ছিলেন। এসময় মসজিদের ভেতরে প্রায় ৪০ জনের মতো মুসল্লি ছিলেন। বিস্ফোরণে তাদের প্রায় প্রায় সবাই দগ্ধ হন। দগ্ধদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।
ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ডা. সামন্ত লাল সেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমরা আসলে কারও বিষয়েই এখনি শঙ্কামুক্ত হতে পারছি না। কারণ বেশিরভাগেরই শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কতজন এই সংগ্রামে টিকে থাকতে পারেন সেটা কেউ বলতে পারে না।'








