জেএমবির উত্থান যে কারণে

জামাল উদ্দিন
২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ১১:৫৪আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০৩

জেএমবি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর পেছনে দেশি-বিদেশি অশুভ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাকেই দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের সামাজিক সহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার জন্যই জঙ্গিদের একটি পক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। আর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই জঙ্গিরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে মনে করেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে পাঁচশ স্পটে বোমা ফাটিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছিল জেএমবি। এরপর সংগঠনটির শীর্ষনেতা শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইসহ সংগঠনটির শীর্ষনেতাদের গ্রেফতার এবং ২০০৭ সালে ফাঁসি কার্যকর করার পর সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সংগঠনটি। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে সংগঠনটি ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।

জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা আমির শায়খ আবদুর রহমানসহ ছয় শীর্ষস্থানীয় নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মাওলানা সাইদুর রহমান জেএমবির আমির হন। ২০১০ সালে গ্রেফতার হন মাওলানা সাইদুর। এরপরও তিনি কারাগার থেকে সংগঠনের বাইরে থাকা কর্মীদের নির্দেশনা দিতে থাকেন। একই সময়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন জেএমবি নেতা ফাহিম। কয়েকমাস জেল খাটার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে নিজেকে জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে ঘোষণা দেন ফাহিম। তাকেও কয়েক মাস আগে রাজধানীর উত্তরা থেকে সাত সহযোগীসহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল সার্বিকভাবে সংগঠনটি নির্মূল না হলেও এটি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে যায় গতকাল। রাজধানীর মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে বৃহস্পতিবার প্রায় ১৪ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে জেএমবির সাতজনকে আটক ও তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও হ্যান্ড গ্রেনেড উদ্ধার করে। এই বিস্ফোরকগুলো দিয়ে দুই শতাধিক বোমা বানানো সম্ভব ছিল বলে মনে করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

এর আগে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ত্রিশাল ও ভালুকার মাঝামাঝি সাইনবোর্ড এলাকায় ফিল্মি স্টাইলে দিন-দুপুরে পুলিশের প্রিজনভ্যানে হামলা চালায় জেএমবির সদস্যরা। গুলি ও বোমা ফাটিয়ে সাজাপ্রাপ্ত জেএমবির শীর্ষজঙ্গি সালাউদ্দিন ওরফে সালেহিন ওরফে সজিব, জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান এবং রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেয় তারা। ওইদিন কাশিমপুর কারাগার থেকে এসব জঙ্গিকে একটি মামলায় হাজির করার জন্য ময়মনসিংহের আদালতে নেওয়া হচ্ছিল।

জঙ্গিদের এ হামলায় পুলিশ কনস্টেবল আতিকুল ইসলাম আতিক নিহত হন। আহত হন পুলিশের অপর দুই সদস্য হাবিবুর রহমান ও সোহেল রানা। পরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন রাকিব হাসান। কিন্তু ভয়ঙ্কর জঙ্গি সালেহিন ও বোমারু মিজান অদ্যাবধি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

এ ঘটনার পর বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, জঙ্গি থাকলেও তারা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু বিদেশি হত্যা, রাজধানীতে শিয়াদের হোসনি দালান ও শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে বোমা হামলাসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলাগুলোর জন্য জেএমবিকেই দায়ী করা হচ্ছে। তবে এর পেছনে মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াত-শিবিরের ইন্ধন ও মদদ রয়েছে বলে মনে করেন সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত সেপ্টেম্বর মাস থেকেই হঠাৎ করে জঙ্গিরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠা শুরু করে। যখন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ এই উপ-মহাদেশের জঙ্গিদের সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই-এর নিবিড় একটা সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশের জঙ্গিদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কিছু বিষয় ইতোমধ্যে জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণে তারা তাদের একজন কূটনীতিককে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে। এতেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে জেএমবিসহ যেসব জঙ্গি সংগঠন রয়েছে, সেগুলো পাকিস্তানসহ বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করছে। এই পৃষ্টপোষকতার মাধ্যমে জঙ্গিদের মধ্যে চাঙ্গাভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার কারণেই তারা আবার চাঙ্গা বা সক্রিয় হয়ে উঠছে।

মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, অভ্যন্তরীণ একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এ দলটির কাছ থেকে অতীতেও জঙ্গি সংগঠনগুলো পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে। এখনও পাচ্ছে। জঙ্গিদের ব্যবহার করে তারা সামাজিক সহিষ্ণুতা এবং দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এর অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে আক্রমণ করে একটি ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিদেশিদের হত্যা, শিয়া ও পীর মাশায়েখের ওপর হামলা এবং খৃষ্টান ধর্ম যাজকের ওপর হামলা করে তাদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়। এতেই মনে হচ্ছে সমাজের ভেতরে অসহিষ্ণুতা ও হানাহানি সৃষ্টি করাটাই হচ্ছে তাদের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, একে অপরের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর বিষয়টি আমাদের দেশে ঐতিহাসিকভাবেই নেই। আর এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যেও বিভিন্ন মহলের ওপর হামলাগুলো করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, এ দেশে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও চলমান উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঠেকাতে তারা জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা ও মদদ দিচ্ছে। এজন্য তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের সম্পদে পরিণত করতে হবে।

/এএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম