একাত্তর টিভি বয়কট ও সাংবাদিকের ফোন নম্বর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর অন্যায় ও গর্হিত অপরাধ করেছেন বলে মনে করেন সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রযুক্তি বিষয়ের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, তিনি (নুর) একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছেন, যা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে পড়ে না। ভিপি নুর নিজেও এখন বলছেন, মোবাইল নম্বরটি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া উচিত হয়নি, এটা মিসটেক হয়েছে।
উল্লেখ্য, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ফেসবুক স্ট্যাটাস ও লাইভে এসে ৭১ টিভির পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেন। এরপর তিনি এই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলটিকে বয়কটের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ৭১ টেলিভিশন থেকে যে নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে টকশোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, সেই নম্বরটিও তিনি ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ওই নম্বরটি একাত্তর টিভির একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নম্বর।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহ-সভাপতি সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ও কোষাধ্যক্ষ দীপ আজাদ এক যৌথ বিবৃতিতে বুধবার (১৪ অক্টোবর) বলেছেন, কোনও টেলিভিশনে তিনি টকশোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতেই পারেন। কিন্তু সেই টেলিভিশনকে বয়কট করার জন্য সামাজিক মাধ্যমে নুর যে তৎপরতা চালিয়েছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একাত্তর টিভির সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ফেসবুকে শেয়ার করে তিনি গর্হিত অপরাধ করেছেন। সেই নম্বরে প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী চক্র ওই সাংবাদিককে ক্রমাগত অশ্লীল মন্তব্য ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য নুর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। তিনি যদি এই অবস্থান থেকে সরে এসে ক্ষমা না চান, তাহলে তাকে গণমাধ্যমের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। একই বিবৃতি দিয়েছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।
এ বিষয়ে আইটি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ব্যাকডোর প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রাইভেসি অ্যাক্ট সম্পর্কে নুরুল হক নুরদের কোনও ধারণা নেই। ৭১ টিভি তাকে ফোন দিয়েছিল সেটা তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু যে নম্বর থেকে তাকে ফোন দেওয়া হয়েছে, সেটা তিনি কোনোভাবেই প্রকাশ করতে পারেন না। এই নম্বরটি যদি কারও ব্যক্তিগত হয়ে থাকে, সেটা শেয়ার করার কারণে তিনি নিশ্চয়ই সামাজিকভাবে এখন হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এতে একজন ব্যক্তিকে আক্রমণ হয়ে গেলো, প্রতিষ্ঠানকে নয়। আইন ও সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কেও কোনও ধারণা না থাকায় এটা হয়েছে। নুরুল হকের মতো একজন দায়িত্বশীল মানুষ তো এটা করতেই পারেন না।’
তানভীর হাসান জোহা আরও বলেন, ‘একটা নম্বর তখনই তিনি দিতে পারেন, যদি কোনও নম্বর থেকে উনাকে কেউ হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকে। তিনি থানায় জিডি করেছেন। কিন্তু কোনও প্রতিকার পাচ্ছেন না। সেক্ষেত্রেও নম্বরটা দেওয়া ঠিক না। কারণ, এতে মামলার তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা উদ্দেশ্যমূলক দেওয়া হয়েছে বলেই আমি মনে করি।’
ফেসবুকে ৭১ টিভির সাংবাদিকের নম্বর ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি করার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে গণমাধ্যমে আমরা দেখেছি। তবে এ বিষয়ে এখনও কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছে বলে শুনিনি। পুলিশ অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।’
বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে নুরুল হক নুরের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে কারও ব্যক্তিগত নম্বর এভাবে শেয়ার করি উচিত হয়নি। আমি ব্লার করে দিয়েছি, কিন্তু সেটি ব্লার হয়নি৷ এটা মিসটেক হয়েছে।’
আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘একাত্তর টিভির মতো একটি পক্ষপাতমূলক গণমাধ্যমের পক্ষে সাংবাদিক নেতারা কথা বলছেন। কিন্তু তারা সাংবাদিকদের অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তো তেমন সোচ্চার হন না। আমরা দেখেছি, সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে তারা নীরব। যখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গণভবনে প্রবেশ করতে দিই না।’ তখন সাংবাদিক নেতারা সোচ্চার হন না। অথচ এসব বিষয় নিয়ে আমরাই কথা বলেছি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আমরা একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছি৷ সাংবাদিক নেতাদের পক্ষ থেকে যে দুঃখ প্রকাশের কথা বলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমি দুঃখ প্রকাশ করার মতো কিছু দেখছি না৷ কোন গণমাধ্যমকে আমি বয়কট করবো, কোনটি গ্রহণ করবো, সেটি আমার ব্যক্তিগত বিষয়।’








