কয়েকবছর ধরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে টার্গেট কিলিং করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মোজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। তবে, টার্গেট কিলিংয়ের ধরন পরিবর্তনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহ করেছে বলে দাবি করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লষকরা। তাদের মতে, সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। এ কারণে, জেএমবি সদস্যরা দূরবর্তী স্থান থেকে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে এসব স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহ করেছেন। রবিবার চট্টগ্রামে জেএমবির আস্তানা থেকে সেনাবাহিনীর পোশাক, বিস্ফোরক, স্নাইপার রাইফেল উদ্ধারের পর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারাও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, জেএমবি প্রযুক্তি নির্ভরতার পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলো মোবাইল জ্যামার, বাইসাইকেল বোমা, ডিজিটাল ম্যাপ, কেমিক্যাল বোমা ব্যবহার করার পর এখন তারা স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে, জঙ্গিদের হাতে এই অস্ত্র থাকায় উদ্ভিগ্ন বিশ্লেষকরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেএমবি নতুনভাবে সংগঠিত হচ্ছে। তাদের বিস্তৃতি চট্টগ্রাম-রাজশাহীসহ দেশের বর্ডার এলাকায় ছড়িয়েছে। সন্দেহের বিষয় হচ্ছে জঙ্গি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কি বাংলাদেশে হচ্ছে, না কি বর্ডারের ওপাশ থেকে আসছে? কারণ, ভারত কিছুদিন আগে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল, ভারতের বর্ডার কেন্দ্রিক জেএমবির বড় সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে, বাংলাদেশ হয়তো ভারতের সেই তথ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। তবে, আমার মনে হচ্ছে বর্ডার ক্রস করে নির্দেশনা আসছে। জেএমবির বড় ঘাটি বর্ডারের ওইপাশেই।’
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জেএমবি সারাদেশে ছড়িয়ে পরেছে। তাদের অর্থসহায়তাকারীকে খুঁজে বের করতে হবে। তাদের নির্মূল করতে হবে। জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেরাই তৈরি করছে গ্রেনেড, হাত বোমা ও কেমিক্যাল বোমা। এমনকি, দুই কিলোমিটার দূর থেকে টার্গেট করে হামলা চালানোর জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্নাইপার রাইফেলও সংগ্রহ করছেন। মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়ায়, তারা দূর থেকে হামলার জন্য এই রাইফেল সংগ্রহ করেছেন।’
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো উদ্ধার করা এমকে-১১ স্নাইপার রাইফেল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সেমি অটো রাইফেলটি নিখুঁতভাবে দূরবর্তী বস্তুর ওপর আঘাত হানতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটান পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ডিবি) বাবুল আকতার। তিনি জানান, ‘এটি সাধারণত মার্কিন বিশেষ বাহিনী নেভি সিল ব্যবহার করে। এমকে-১১ সেমি অটোমেটিক স্নাইপার রাইফেলের নিশানা অত্যন্ত নিখুঁত’। এর কার্যকরী রেঞ্জ ১৫০০ গজ এবং প্রতি মিনিটে ৭৫০ রাউন্ড গুলি ফায়ার করা সম্ভব।
স্নাইপার রাইফেলের বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্বের ১১ টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই স্নাইপার রাইফেল ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশও তাদের মধ্যে একটি। তবে এই রাইফেল খোলাবাজারে বিক্রি হয়না। এই রাইফেল জঙ্গিদের হাতে এলো কিভাবে?’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরা টার্গেট কিলিংয়ের জন্য এই রাইফেল ব্যবহার করত। এটিই যে একটিমাত্র রাইফেল জেএমবির হাতে। এমনটি ভাবলে চলবে না।’
এরআগে জেএমবির কাছ থেকে ড্রোন, মোবাইল জ্যামা, বাইসাইকেল বোমা, গ্রেনেডে, কেমিক্যাল বোমা এবং সর্বশেষ স্নাইপার রাইফেল উদ্ধার করা হলো।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেএমবি নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। সেপ্টেম্বরর পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়েছে। মানুষকে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পোশাক সংগ্রহ করে সুরক্ষিত কোনও এলাকায় হামলা চালিয়ে টার্গেট কিলিংয়ের জন্য তারা স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী বাংলাদেশের জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তাই তারা আবার মাথাচারা দিয়ে উঠছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার উদ্দেশ্যে জেএমবি এই স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহ করেছে।’
আব্দুর রশীদ আরও বলেন, ‘বর্ডার ক্রসিং হয়ে দেশে বিস্ফোরক ও অস্ত্র প্রবেশ করছে। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও দেশীয় জঙ্গিদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছেন। এমনকি নিলামে তারা অস্ত্র বিক্রিও করছেন জঙ্গিদের কাছে।’
গত চার মাসে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ১৯টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে হিন্দুদের মন্দির, খ্রিষ্টান ধর্মযাজক, বাহাই, শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হয়েছে।
সর্বশেষ হামলা হয়েছে গত শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে।
সবগুলো হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক এস্টেট (আইএস)। তবে, পুলিশ বেশ কয়েকটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে জেনেছে, জেএমবি এসব হামলার সঙ্গে জড়িত।
/এআরআর/ এমএনএইচ/








