উজি’র অস্ত্র ব্যবহারকারী ৫৭ জনকে খুঁজছে পুলিশ

নুরুজ্জামান লাবু
০৫ নভেম্বর ২০২০, ১৫:০০আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২০, ২১:০২

মিলিটারি ব্র্যান্ডের অত্যাধুনিক ও সেমি অটোমেটিক উজি অস্ত্র

মিলিটারি ব্র্যান্ডের অত্যাধুনিক ও সেমি অটোমেটিক উজি অস্ত্র ব্যবহারকারী ৫৭ জনকে খুঁজছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে ছয়টি অস্ত্র আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত পাঁচ বছরে তারা কার কার কাছে উজি ব্র্যান্ডের মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্রগুলো বিক্রি করেছিল, তাদের নাম-ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকা পেলে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তদন্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে উজি অস্ত্র ব্যবহারকারীদের তালিকা চেয়ে চিঠি দিয়েছি। নাম-ঠিকানা পেলে অস্ত্র ব্যবহারকারীদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’

চলতি বছরের ২০ আগস্ট মিনাল শরীফ নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে লাইসেন্সসহ একটি উজি ব্র্যান্ডের পিস্তল উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। উদ্ধারের পর অস্ত্রটির সঙ্গে লাইসেন্সের মধ্যে গরমিল পেয়ে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, পয়েন্ট টু টু বোরের রাইফেল ব্যবহারের লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই উজি ব্র্যান্ডের অত্যাধুনিক পিস্তল ব্যবহার করছে। আইনের ফাঁক গলে অস্ত্র আমদানিকারকরা পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল আমদানি করার বদলে পয়েন্ট টু টু বোরের অত্যাধুনিক পিস্তল আমদানি করেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, পয়েন্ট টু টু বোরের লাইসেন্সের বিপরীতে উজি পিস্তল উদ্ধারের পর তারা অস্ত্রটি পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইএমই শাখায় পাঠিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত চেয়েছিলেন। অস্ত্রটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেনা সদর থেকে এই অস্ত্রকে অত্যাধুনিক উল্লেখ করে এটি মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়। বিশেষজ্ঞ মতামতে সেনা সদরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লাইসেন্সে পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল ও উজির পিস্তল বা রাইফেল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র। অস্ত্র দুটির স্পেয়ার পার্টস, ওজন ও দৈর্ঘ্য ছাড়াও বিভিন্ন পার্থক্য রয়েছে। এছাড়া এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত পিস্তলের চেয়ে অত্যাধুনিক। এর ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা বিশ রাউন্ড। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত পিস্তলগুলোর সর্বাধিক ম্যাগাজিন ধারণক্ষমতা ১৫ রাউন্ড। এই মতামতের পরপরই নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অত্যাধুনিক এই অস্ত্র দেশের জঙ্গি বা সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে পৌঁছালে তা আইনশৃঙ্খলার জন্য বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সারা দেশে ৮৪টি লাইসেন্সধারী বৈধ অস্ত্র বিক্রির প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিদেশ থেকে সরাসরি অস্ত্র আমদানি করে থাকে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ১৪ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাইকারি দামে অস্ত্র কিনে নিয়ে লাইসেন্সের বিপরীতে খুচরা বিক্রি করে থাকে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি রাজধানী ঢাকায় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, তারা নথিপত্র ঘেঁটে জানতে পেরেছেন ২০১৫ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে ছয়টি প্রতিষ্ঠান উজি ব্র্যান্ডের পিস্তল ও রাইফেল আমদানি করেছে। এগুলো হলো এমএইচ আর্মস কোং, মঈন আর্মস কোং, আহম্মদ হোসেন আর্মস কোং, মেসার্স তোজাম্মেল হোসেন, কে আহমদ আর্মস অ্যান্ড কোং ও শফিকুল ইসলাম আর্মস অ্যান্ড কোং। এই ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমএইচ আর্মস কোং ৫০টি উজি পিস্তল আমদানি করেছিল। এর মধ্যে ২৩টি ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। মঈন আর্মস কোং দশটি উজি পিস্তল ও বিশটি উজি রাইফেল আমদানি করেছিল। তাদের আমদানি করা দশটি পিস্তলই বিক্রি হয়ে গেছে। বিশটি রাইফেলের মধ্যে চারটি বিক্রি হয়েছে। আহম্মদ হোসেন আর্মস কোং এবং মেসার্স তোজাম্মেল হোসেন যৌথভাবে ২০টি উজি পিস্তল আমদানি করেছিল। তারা ইতোমধ্যে ৯টি বিক্রি করেছে। কে আহমদ আর্মস অ্যান্ড কোং ৫টি আমদানি করে ইতোমধ্যে পাঁচটিই বিক্রি করে ফেলেছে। শফিকুল ইসলাম আর্মস অ্যান্ড কোং ৬টি উজি পিস্তল আমদানি করে ইতোমধ্যে দুটি বিক্রি করেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, একটি উজি পিস্তল সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকায় বিক্রি হয়। তারা ইতোমধ্যে এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ক্রেতাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করছেন। ক্রেতাদের নামের তালিকা পেলে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্ট্যাটাস বিবেচনা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করবেন। ব্যবহারকারীদের মধ্যে কারও হাতে থাকা উজি পিস্তল থাকাটা বিপজ্জনক মনে হলে তার অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা ইতোমধ্যে বিষয়টি লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। চিঠিতে আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে আমদানি, বিক্রয় ও মজুতকৃত উজি পিস্তলসহ এই ধরনের সকল অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রগুলো বাজেয়াপ্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া যেতে পারে বলেও সুপারিশে বলা হয়েছে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেছে। অস্ত্রের লাইসেন্সে ক্যালিবারের পাশাপাশি ধরন ও ম্যাগাজিন ক্যাপাসিটিসহ বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করার প্রক্রিয়া চলছে।

 

/এমআর/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক